Saturday, May 20, 2017

Ramsita Temple, Serampore, Hooghly


রামসীতা  মন্দির,  শ্রীরামপুর,  হুগলি 

শ্যামল  কুমার  ঘোষ 

            হাওড়া-ব্যাণ্ডেল  রেলপথে  শ্রীরামপুর অষ্টম  রেলস্টেশন।  হাওড়া  থেকে  রেলপথে  দূরত্ব  ২০  কিমি।  গ্রান্ট  ট্রাঙ্ক  রোড  এই  শহরের  উপর  দিয়ে  চলে  গেছে।  ১৭৫৩  খ্রীষ্টাব্দে  শেওড়াফুলির  রাজা  রাজচন্দ্র  রায়  এখানে  রামসীতার  মন্দির  নির্মাণ  করেন।  এই  শ্রীরামচন্দ্র  জিউ  থেকে  শ্রীরামপুর  নামটি  উদ্ভূত  হয়েছে।  ১৭৫৭  খ্রীষ্টাব্দে  ডেনীয়  বা  দিনেমাররা  ডেনমার্কের  তৎকালীন  রাজা  পঞ্চম  ফ্রেডরিকের  নামানুসারে  এই  শহরের  নাম  রাখেন  ফ্রেডরিক  নগর।  শ্রীপুর,  আকনা,  গোপীনাথপুর,  মোহনপুর  ও  পেয়ারাপুর  এই  পাঁচটি  স্থান  নিয়ে  ফ্রেডরিক  নগর  গঠিত  হয়।  বার্ষিক  ১৬০১  সিক্কা  টাকা  খাজনায়  দিনেমাররা  শেওড়াফুলি-রাজের  কাছ  থেকে  এই  স্থানগুলি  ইজারা  নেয়।  ১৮৪৫  খ্রীষ্টাব্দে  ইংরাজরা  ডেনীয়দের  কাছ  থেকে  এই  শহরটিকে  কিনে  নেন।  আগে  শ্রীরামপুর  মহকুমা  ছিল  না।  ইংরাজদের  হাতে  আসার  পর  ১৮৪৭  খ্রীষ্টাব্দে   দ্বারহাট্টা  মহকুমার  বদলে  শ্রীরামপুর  মহকুমা  হয়।  বিশপ  হেবার  শ্রীরামপুর  সম্পর্কে  বলেছিলেন  যে  এই  শহরটি  কলকাতার  চেয়ে  বেশি  ইউরোপীয়।  

             শ্রীরামপুর  স্টেশন  থেকে  ২  কিমি  দক্ষিণে  বটতলার  কাছে  রামসীতা  লেনে  অবস্থিত  রামসীতার  মন্দির।  অল্প  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  স্থাপিত,  ত্রিখিলানযুক্ত,  পশ্চিমমুখী,  ছোট  দালান  মন্দির।  গর্ভগৃহের  সামনে  অলিন্দ,  তার  সামনে  রোয়াক।  মন্দিরটি  গাছ-গাছালিতে  ভরা।  গর্ভগৃহে  ঢোকার  একটিই  প্রবেশদ্বার।  গর্ভগৃহে  একটি  কাঠের  সিংহাসনে  রামচন্দ্র,  লক্ষণ,  সীতাদেবী  ও  হনুমানের  মূর্তি  বিরাজমান।  এছাড়া  অন্যান্য  বিগ্রহও  আছেন।   

          শেওড়াফুলি  ( পূর্বনাম  সাড়াপুলি )  রাজবংশের  প্রতিষ্ঠাতা  রাজা  মনোহর  চন্দ্র  রায়ের  পুত্র  রাজা  রাজচন্দ্র  রায়  ৭ ই  জ্যৈষ্ঠ,  ১১৬০  বঙ্গাব্দে  (  ১৭৫৩  খৃষ্টাব্দে )  মন্দির  ও  বিগ্রহগুলি  প্রতিষ্ঠা  করেন।  তিনি  বিগ্রহের  সেবা  নির্বাহের  জন্য  তিন  শ'  বিঘা  জমি  দেবোত্তর  করেন।  কিন্তু  সেই  জমির  কিছুই  আজ  মন্দির  কর্তৃপক্ষের  হাতে  নেই।  শ্রীরামচন্দ্রের  নামে  শ্রীপুর,  মোহনপুর  ও  গোপীনাথপুর  এই  তিনটি  গ্রামের  মিলিত  নাম  হয়  শ্রীরামপুর।  ডক্টর  হেমেন্দ্রনাথ  দাশগুপ্ত  লিখেছেন,  "শ্রীপুর,  মোহনপুর  ও  গোপীনাথপুর  নামক  তিনটি  গ্রাম  শ্রীরামচন্দ্র  বিগ্রহের  সেবায়  দেবোত্তর  করেছিলেন  বলে  গঙ্গাতীরস্থ  শ্রীরামপুর  তীর্থস্থান।"  মন্দিরে  সকল  বিগ্রহ  নিত্য  পূজিত।  মন্দিরে  নিত্য  পূজা  ছাড়াও  রামনবমীতে  তে  বড়  করে  উৎসব  পালিত  হয়। 


রামসীতা  মন্দিরের  ফটক 

দরজার  উপরে  লাগানো  ফলক 

রামসীতা  মন্দির,  শ্রীরামপুর,  হুগলি 
মন্দিরের  দেওয়ালে  অঙ্কিত  একটি  পুরানো  চিত্র

শ্রীরামচন্দ্র  ও  অন্যান্য  বিগ্রহ

রাম,  লক্ষ্মণ  ও  সীতাদেবীর  বিগ্রহ

            শ্রীরামপুরের  উপরোক্ত  মন্দিরে  যেতে হলে  হাওড়া  থেকে  ব্যাণ্ডেল  গামী  যে  কোন  ট্রেন  ধরুন।  নামুন  শ্রীরামপুরে।  স্টেশনের  বাইরে  থেকে  অটো  বা  টোটোতে  উঠে  বটতলা  মোড়ে  নামুন।  সেখান  থেকে  দে  স্ট্রীট  ধরে  কিছুটা  হেঁটে  রামসীতা  লেনে  অবস্থিত  মন্দিরে  পৌঁছে  যান। 


     সহায়ক  গ্রন্থাবলী / সূত্র  :    
                 ১)  হুগলি  জেলার  পুরাকীর্তি :  নরেন্দ্রনাথ  ভট্টাচার্য
                 ২)  হুগলি  জেলার  ইতিহাস  ও  বঙ্গসমাজ  :  সুধীরকুমার  মিত্র  
                 ৩)  মন্দিরে  লাগানো  প্রস্তর-ফলক 

Friday, May 19, 2017

Gouranga Temple, Chatra Doltala, Serampore, Hoghly


গৌরাঙ্গ  মন্দির,  চাতরা  দোলতলা,  শ্রীরামপুর,  হুগলি 

শ্যামল  কুমার  ঘোষ

            হাওড়া-ব্যাণ্ডেল  রেলপথে  শ্রীরামপুর অষ্টম  রেলস্টেশন।  হাওড়া  থেকে  রেলপথে  দূরত্ব  ২০  কিমি।  গ্রান্ট  ট্রাঙ্ক  রোড  এই  শহরের  উপর  দিয়ে  চলে  গেছে।    ১৭৫৩  খ্রীষ্টাব্দে  শেওড়াফুলির  রাজা  রাজচন্দ্র  রায়  এখানে  রামসীতার  মন্দির  নির্মাণ  করেন।  এই  শ্রীরামচন্দ্র  জিউ  থেকে  শ্রীরামপুর  নামটি  উদ্ভূত  হয়েছে।  ১৭৫৭  খ্রীষ্টাব্দে  ডেনীয়  বা  দিনেমাররা  ডেনমার্কের  তৎকালীন  রাজা  পঞ্চম  ফ্রেডরিকের  নামানুসারে  এই  শহরের  নাম  রাখেন  ফ্রেডরিক  নগর।  শ্রীপুর,  আকনা,  গোপীনাথপুর,  মোহনপুর  ও  পেয়ারাপুর  এই  পাঁচটি  স্থান  নিয়ে  ফ্রেডরিক  নগর  গঠিত  হয়।  বার্ষিক  ১৬০১  সিক্কা  টাকা  খাজনায়  দিনেমাররা  শেওড়াফুলি-রাজের  কাছ  থেকে  এই  স্থানগুলি  ইজারা  নেয়।  ১৮৪৫  খ্রীষ্টাব্দে  ইংরাজরা  ডেনীয়দের  কাছ  থেকে  এই  শহরটিকে  কিনে  নেয়।  আগে  শ্রীরামপুর  মহকুমা  ছিল  না।  ইংরাজদের  হাতে  আসার  পর  ১৮৪৭  খ্রীষ্টাব্দে   দ্বারহাট্টা  মহকুমার  বদলে  শ্রীরামপুর  মহকুমা  হয়।  বিশপ  হেবার  শ্রীরামপুর  সম্পর্কে  বলেছিলেন  যে  এই  শহরটি  কলকাতার  চেয়ে  বেশি  ইউরোপীয়। 

            শ্রীরামপুর স্টেশন  থেকে  ২  কিমি  উত্তরে  চাতরা।  এখানকার  চৌধুরী  পাড়ার  দোলতলায়  গৌরাঙ্গ  মন্দির  শ্রীচৈতন্যের  পার্ষদ  কাশীশ্বর  পণ্ডিত  কর্তৃক  প্রতিষ্ঠিত  বলে  কথিত।  মন্দিরে  একটি  সংস্কারকালীন  ফলকে  "কাশীশ্বর  পীঠ   স্থাপিত :  ১৪৫৫  শকাব্দ"  ( ১৫৩৩-'৩৪  খ্রীষ্টাব্দ )  বলে  লেখা  আছে।  কিন্তু  কোন  কোন  গ্রন্থে  এটির  নির্মাণ  ১৬৮০  খ্রীষ্টাব্দ  বলে  উল্লেখ  করা  হয়েছে।  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  প্রতিষ্ঠিত,  দক্ষিণমুখী,  পাশাপাশি  ও  পরস্পর  সংলগ্ন  তিনটি  মন্দির।  বাস্তুশাস্ত্রের  'ত্রৈকুটক'  রীতিতে  নির্মিত।  পাশাপাশি  তিনটি  শিখর।  মাঝেরটি  বৃহত্তম  ( আনুমানিক  ৫০ ফুট )।  শিখরগুলি  পিরামিডাকার  ও  রেখ  ধরণের  খাঁজকাটা।  মন্দিরের  সামনের  সমতল  ছাদ  বিশিষ্ট  বারান্দা  পরবর্তীকালে  সংযোজিত।  মূল  মন্দিরের  সামনে  একটি  দরজা,  পিছনে  একটি  জানলা।  পাশের  দুটি  মন্দিরে  সামনে  একটি  করে  দরজা  ও  পাশে  আর  একটি  করে  দরজা।  মূল  মন্দির  থেকে  পাশের  দুটি  মন্দিরে  যাওয়ার  জন্য  আরও  দুটি  দরজা  আছে।   

            মূল  মন্দিরে  পাশাপাশি  দুটি  কাঠের  সিংহাসনে  কৃষ্ণ-রাধা  ও  শ্রীগৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়া  বিরাজ  করছেন।  এই  দুই  সিংহাসনের  মাঝে  আর  একটি  কৃষ্ণও  আছেন।  এই  আগের  কৃষ্ণ  বিগ্রহের  একটি  পা  পুরোহিতের  অসাবধানতায়  ভগ্ন  হলে  শাস্ত্রানুযায়ী  অন্য  একটি  কৃষ্ণ  প্রতিষ্ঠা  করা  হয়।  পশ্চিম  দিকের  মন্দিরটি  ভোগঘর  হিসাবে  ব্যবহার  করা  হয়।  পূর্ব  দিকের  মন্দিরটি  শয়নকক্ষ  হিসাবে  ব্যবহৃত  হয়।  রাতে  এই  ঘরে  একটি  খাটে  কৃষ্ণ-রাধিকা  ও  অপর  একটি  খাটে  গৌরাঙ্গ-বিষ্ণুপ্রিয়া  শয়ন  করেন। 

            পঞ্চদশ  শতকে  বাসুদেব  ভট্টাচার্য  এখানে  শ্রীকৃষ্ণের  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠা  করেন।  অন্য  মতে,  তাঁর  পুত্র  ও  মহাপ্রভুর  অন্যতম  পরিকর  কাশীশ্বর  পণ্ডিত  মন্দির  ও  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠা  করেন।  কাশীশ্বর  পুরীধামে  থেকে  গৌরাঙ্গ  ও  বিষ্ণুপ্রিয়ার  দুটি  মূর্তি  এনে  শ্রীকৃষ্ণ  বিগ্রহের  পাশে  স্থাপন  করেন।  কথিত  আছে,  কাশীশ্বর  পণ্ডিতের  আহ্বানে  মহাপ্রভু   বল্লভপুরে  রাধাবল্লভজিউর  পাটে  দ্বাদশ  গোপালের  মহোৎসবে  যোগদান  করার  জন্য  যখন  আসেন  তখন  পথিমধ্যে  তিনি  এই  মন্দিরে  আসেন। অন্য  মতে,  মহাপ্রভু  পদব্রজে  পুরী  যাওয়ার  পথে  বৈদ্যবাটির  নিমাই  তীর্থের  ঘাট  থেকে  চাতরার  এই  মন্দিরে  এসেছিলেন।  মন্দিরে  তাঁর  নিজের  মূর্তি  দেখে  তিনি  ক্ষুব্ধ  হন  এবং  তাঁর  মূর্তি  গঙ্গায়  বিসর্জন  দিতে  বলেন।  সেই  নির্দেশ  পালিত  হয়।  বিষ্ণুপ্রিয়া  দেবীর  বিগ্রহ  শ্রীকৃষ্ণ-রাধিকার  পাশে  বহুদিন  ছিল।  পরে  মহাপ্রভু  অপ্রকট  হওয়ার  পরে  কাশীশ্বর  পণ্ডিতের  পৌত্র  পুনরায়  মহাপ্রভুর  মূর্তি  প্রতিষ্ঠা  করেন।  ১৭৪০  খ্রীষ্টাব্দে  বর্গীদের  দ্বারা  গৌরাঙ্গ  মন্দিরের  যাবতীয়  বিগ্রহের  সমস্ত  অলংকারাদি  লুন্ঠিত  হয়।  তখন  লক্ষাধিক  টাকার  হীরা-জহরত  ও  সোনার  গহনা  ঠাকুরের  ছিল।  কথিত,  এখানকার  কৃষ্ণ  বিগ্রহ  জাগ্রত  জেনে  বিষ্ণুপুররাজ  বীর  হাম্বির  নাকি  জোর  করে  করে  মূর্তিটি  বিষ্ণুপুরে  নিয়ে  যান।  পরবর্তী  কালে  তাঁর  পৌত্র  শ্রীকৃষ্ণ  বিগ্রহ  এক  লক্ষ  টাকায়  বাগবাজারের  গোকুল  মিত্রের  কাছে  আবদ্ধ  রাখেন।  তবে  ঘটনাটির  সত্যতার  সঠিক  কোন  প্রমাণ  নেই।  মন্দিরের  সামনের  প্রাঙ্গনে  অবস্থিত  দোলমঞ্চদ্বয়  নতুন  করে  নির্মাণ  করা  হয়েছে।  মন্দিরে  সকল  বিগ্রহ  নিত্য  পূজিত।  মন্দিরে  নিত্য  পূজা  ছাড়াও  দোল,  রাস,  জন্মাষ্টমি  ইত্যাদি  অনুষ্ঠান  পালন  করা  হয়।              

গৌরাঙ্গ  মন্দির,  শ্রীরামপুর,  হুগলি 

মন্দিরের  শিখর-দেশ 

পুরাতন  শ্রীকৃষ্ণ  বিগ্রহ 

নতুন  শ্রীকৃষ্ণ  ও  রাধিকা  বিগ্রহ  

গৌরাঙ্গ  ও  রাধিকা  বিগ্রহ 

শিবলিঙ্গ 
         
            শ্রীরামপুরের  উপরোক্ত  মন্দিরে  যেতে হলে  হাওড়া  থেকে  ব্যাণ্ডেল  গামী  যে  কোন  ট্রেন  ধরুন।  নামুন  শ্রীরামপুরে।  স্টেশনের  বাইরে  রেললাইনের  ধার   থেকে  ( শেওড়াফুলির  দিকে ) টোটোতে  উঠে  দোলতলায়  নামুন।  সেখান  থেকে  হেঁটে  মন্দির। 
             

সহায়ক  গ্রন্থাবলী :
         ১)  হুগলি  জেলার  পুরাকীর্তি :  নরেন্দ্রনাথ  ভট্টাচার্য 
        )  হুগলি  জেলার  দেব  দেউল  :  সুধীর  কুমার  মিত্র
        ৩)  পশ্চিম  বঙ্গের  মন্দির  :  শম্ভু  ভট্টাচার্য    

Thursday, May 18, 2017

Madanmohan Temple, Akna Choudhuri Para, Serampore, Hooghly


মদনমোহন  মন্দির,  আকনা  চৌধুরীপাড়া,  শ্রীরামপুর,  হুগলি

শ্যামল  কুমার  ঘোষ    

            হাওড়া-ব্যাণ্ডেল  রেলপথে  শ্রীরামপুর অষ্টম  রেলস্টেশন। হাওড়া  থেকে  রেলপথে  দূরত্ব  ২০  কিমি।  গ্রান্ট  ট্রাঙ্ক  রোড  এই শহরের  উপর  দিয়ে  চলে  গেছে।  ১৭৫৩  খ্রীষ্টাব্দে  শেওড়াফুলির রাজা  রাজচন্দ্র  রায়  এখানে  রামসীতার  মন্দির  নির্মাণ  করেন।  এই  শ্রীরামচন্দ্র  জিউ  থেকে  শ্রীরামপুর  নামটি  উদ্ভূত  হয়েছে।  ১৭৫৭  খ্রীষ্টাব্দে  ডেনীয়  বা  দিনেমাররা  ডেনমার্কের  তৎকালীন রাজা  পঞ্চম  ফ্রেডরিকের  নামানুসারে  এই  শহরের  নাম  রাখেন ফ্রেডরিক  নগর।  শ্রীপুর,  আকনা,  গোপীনাথপুর,  মোহনপুর  ও পেয়ারাপুর  এই  পাঁচটি  স্থান  নিয়ে  ফ্রেডরিক  নগর  গঠিত  হয়। বার্ষিক  ১৬০১  সিক্কা  টাকা  খাজনায়  দিনেমাররা  শেওড়াফুলি-রাজের  কাছ  থেকে  এই  স্থানগুলি  ইজারা  নেয়।  ১৮৪৫  খ্রীষ্টাব্দে ইংরাজরা  ডেনীয়দের  কাছ  থেকে  এই  শহরটিকে  কিনে  নেয়। আগে  শ্রীরামপুর  মহকুমা  ছিল  না।  ইংরাজদের  হাতে  আসার পর  ১৮৪৭  খ্রীষ্টাব্দে   দ্বারহাট্টা  মহকুমার  বদলে  শ্রীরামপুর মহকুমা  হয়।  বিশপ  হেবার  শ্রীরামপুর  সম্পর্কে  বলেছিলেন  যে  এই  শহরটি  কলকাতার  চেয়ে  বেশি  ইউরোপীয়। 
   
            শ্রীরামপুর  স্টেশন  থেকে  ২  কিমি  দূরে  আকনা চৌধুরীপাড়া।  এখানে  অবস্থিত  মদনমোহন  জিউর  মন্দির  ১৮৪৫ খ্রীষ্টাব্দে  গোপাল  চন্দ্র  মুখোপাধ্যায়  প্রতিষ্ঠা  করেন।  উচ্চ ভিত্তিবেদির  উপর  স্থাপিত,  দক্ষিণমুখী,  আটচালা  শৈলীর  বৃহৎ  মন্দির।  উচ্চতা  প্রায়  ৫৫ ফুট।  আবৃত  অলিন্দে  তিন  খিলান বিশিষ্ট  প্রবেশদ্বার।  মন্দিরের  সামনে  দশ  ফুট  উঁচু  সমতল আচ্ছাদনযুক্ত  বারান্দা  যেটি  পরে  সংযোজিত  হয়েছে। গর্ভগৃহের সামনের  দিকে  একটি  প্রবেশদ্বার।  পূর্ব, উত্তর  ও  পশ্চিম  দিকেও  একটি  করে  দরজা  আছে।  গর্ভগৃহে  একটি  কাঠের  সিংহাসনে মদনমোহন  ও  রাধিকা  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠিত।  এ  ছাড়া  অন্যান্য বিগ্রহও  আছেন।  মন্দিরে  সকল  বিগ্রহ  নিত্য  পূজিত।  নিত্য পূজা ছাড়াও  মন্দিরে  দোল,  রাস, ঝুলন  ইত্যাদি  উৎসবও  পালন  করা হয়।        

            মন্দির  প্রতিষ্ঠার  ইতিহাস  অলৌকিক।  এখন  যেখানে ওয়ালশ  হাসপাতাল  ঠিক  সেই  জায়গায়  দক্ষিণ  ভারতীয় রামানুজ সম্প্রদায়ের  ( অন্য  মতে,  নেপালের  ধ্রুবানন্দ  ব্রহ্মচারী সম্প্রদায় )  কিছু  বৈষ্ণব  বাস  করতেন।  তাঁরা  সকলেই  বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন।  তাঁদের  এখানে  একটি  আখড়া  ছিল।  ভজন-কীর্তন  করে তাঁরা  দিন  কাটাতেন।  শেওড়াফুলির  রাজা  মনোহর রায়  তাঁদের আখড়ার  জন্য  বিনামূল্যে  জমি  দেন।  তাঁরা  সেই আখড়ায় মদনমোহনের  একটি  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠা  করেন।  কিন্তু হঠাৎ  তাঁরা কোন  কারণে  এই  স্থান  পরিত্যাগ  করে  অন্যত্র  চলে  যান। আখড়া-ভবনটি  ক্রমশঃ  ধ্বংসপ্রাপ্ত  হয়  এবং  বিগ্রহটি  সেখানে পরিত্যক্ত  অবস্থায়  থেকে  যায়।  কালক্রমে  সেস্থান  জঙ্গলাকীর্ণ হয়। 

            ১৮৩৬  খ্রীষ্টাব্দে  শ্রীরামপুরের  তদানীন্তন  শাসক  দিনেমার সরকার  সেখানে  একটি  হাসপাতাল  তৈরি  করতে  মনস্ত  করেন এবং  জমিটি  অধিগ্রহণ  করেন।  জঙ্গল  পরিষ্কার  করার  সময় পরিত্যক্ত  মদনমোহনের  মূর্তিটি  পাওয়া  যায়। গোপাল  চন্দ্র মুখোপাধ্যায়  দিনেমার  সরকারের  একজন  উচ্চপদস্থ  কর্মচারী ছিলেন।  দিনেমার  সরকার  ও  স্থানীয়  হিন্দু  সম্প্রদায়  গোপাল  চন্দ্র মুখোপাধ্যায়কেই  মদনমোহন  বিগ্রহটির  উপযুক্তভাবে  সেবা  ও  পূজার  দায়িত্ব  গ্রহণের  যোগ্য  ব্যক্তি  বলে  মনে  করেন।  গোপাল চন্দ্র  মুখোপাধ্যায়ও  সানন্দে  উক্ত  দ্বায়িত্ব  গ্রহণে  সম্মত  হন।  দিনেমার  সরকার  বিগ্রহের  সেবা  ও  পূজার  ব্যয়  নির্বাহের  জন্য   গোপালবাবুকে  ব্যৎসরিক  ১২০  টাকা  দিতে  সম্মত  হয়। গোপালবাবু  পুরুষানুক্রমে  শালগ্রামে  শ্রীমধুসূদনের  পূজা করতেন।   মদনমোহন  বিগ্রহ  পাওয়ার  পর  তিনি  বৃন্দাবন  থেকে অষ্টধাতুর   রাধারানি  ও  পাথরের  গোপালের  মূর্তি  নিয়ে  আসেন। শালগ্রামের  সঙ্গে  এই  তিনটি  বিগ্রহ  নিজের  বাড়িতে  ভক্তিভরে পূজার্চনা  করতে  থাকেন। 
  
            ১৮৪৫  সালে  দিনেমার  সরকার  ইস্ট  ইন্ডিয়া  কোম্পানির কাছে  শ্রীরামপুর  বিক্রয়  করে  দেয়।  তখন  নতুন  সরকার  মদনমোহনের  পূজার  জন্য  বার্ষিক  অনুদান  বছরে-বছরে  দেওয়া সম্ভব  হবে  না  বলে  এককালীন  দশ  হাজার  টাকা  গোপালবাবুকে দেয়।  সেই  অর্থে  তিনি  মদনমোহনের  বর্তমান  মন্দিরের নির্মাণকার্য  শুরু  করেন।  মন্দির  নির্মাণে  প্রায়  পঞ্চাশ  হাজার টাকা  ব্যয়  হয়।  কিন্তু  মন্দির  নির্মাণ  শেষ  হওয়ার  আগেই  তিনি দেহত্যাগ  করেন।  এখানে  উল্লেখ্য,  গোপালবাবু   অপুত্রক ছিলেন। পুত্রের  আশায়  তিনি  চার-চারবার  দ্বার  পরিগ্রহ  করেন। এক  পত্নী আগেই  মারা  যান।  তাঁর  মৃত্যুর  কিছু  দিনের  মধ্যেই  দ্বিতীয়  স্ত্রী গত  হন।  তাঁর  তৃতীয়  ও  চতুর্থ  পত্নীদ্বয়  স্বামীর  আরদ্ধ  কাজ শেষ করেন।  তাঁরা  মন্দির  নির্মাণ  শেষ  করে   শালগ্রামের  সঙ্গে  মদনমোহন  জিউ  সহ   তিনটি  বিগ্রহ  নতুন  মন্দিরে  প্রতিষ্ঠা  করেন। 



মদনমোহন  মন্দির, শ্রীরামপুর, হুগলি 

মন্দিরের  শিখর-দেশ  

মদনমোহনের  পূজায়  রত  পুরোহিত 

অন্য  এক  শ্রীকৃষ্ণ  ও  রাধিকা  মূর্তি 

  দুর্গা  মূর্তি  

মদনমোহন  ও  রাধিকা  বিগ্রহ - ১

কাঠের  সিংহাসনের  কারুকার্য 

মদনমোহন  ও  রাধিকা  বিগ্রহ - ২

            মদনমোহন  জিউর  মন্দিরে  যেতে হলে  হাওড়া  থেকে ব্যাণ্ডেল  গামী  যে  কোন  ট্রেন  ধরুন।  স্টেশনের  বাইরে  থেকে অটো  বা টোটোতে  পৌঁছে  যান  বল্লভপুর।  ঠাকুরবাড়ি  স্ট্রীট  ধরে রাধাবল্লভ  জিউর  মন্দির  পেরিয়ে  খানিকটা  হাঁটলেই  মন্দির।  জি. টি. রোড  ধরে  গাড়িতেও  যেতে  পারেন।

 সহায়ক  গ্রন্থাবলী :
         ১)  হুগলি  জেলার  পুরাকীর্তি :  নরেন্দ্রনাথ  ভট্টাচার্য 
         )  হুগলি  জেলার  দেব  দেউল  :  সুধীর  কুমার  মিত্র
         ৩)  শ্রীরামপুরের  ইতিবৃত্ত  ( ১ম  ভাগ ) :  ফণিভূষণ  চক্রবর্তী