Thursday, March 30, 2017

Raghunath Temple, Baksa, Janai Road, Hooghly, West Bengal


     রঘুনাথ মন্দির,  বাকসা,  জনাই,  হুগলি

                               শ্যামল  কুমার  ঘোষ 

            হাওড়া-বর্ধমান  কর্ড  লাইনে  জনাই  রোড  একটি  রেলস্টেশন।  হাওড়া  থেকে  জনাই  রোড  সপ্তম  রেলস্টেশন।  রেলপথে  হাওড়া  থেকে  দূরত্ব  ২০  কিমি। 

            জনাই  গ্রামের  প্রান্তে  অবস্থিত  বাকসা  একটি  সমৃদ্ধ  গ্রাম।  এই  গ্রামের  চৌধুরী,  মিত্র  ও  সিংহ  বংশ  ( এই  বংশে  কালীপ্রসন্ন  সিংহ  জন্ম  গ্রহণ  করেন )  বিশেষ  প্রসিদ্ধ।  এই  গ্রামের  শ্রীশ্রী  রঘুনাথ  জিউর  মন্দির  বাংলার  প্রাচীন  মন্দিরগুলির  মধ্যে  অন্যতম।  বাকসার  মিত্র  বংশের  ভ্রুকুটরাম  মিত্র  ১৭৯২  খ্রীষ্টাব্দে ( বাং  ১১৯৯ )  এই  মন্দির  প্রতিষ্ঠা  করেন  এবং  দৈনিক  সেবার  জন্য  জমি  দান  করেন।  মিত্র  বংশের  কুলদেবতা  রঘুনাথ  শিলার  নামানুসারে  এই  মন্দির  রঘুনাথের  মন্দির  রূপে  পরিচিত।   মন্দিরটি  উঁচু  ভিত্তি  বেদির  উপর  প্রতিষ্ঠিত,  পূর্বমুখী  ও  নবরত্ন  শৈলীর।  সামনে  তিনটি  খিলান  প্রবেশপথ।  গর্ভগৃহের  সামনে  ঢাকা  বারান্দা।  নবরত্নের  চূড়াগুলি  শীর্ণ  ও  লম্বাটে।  পূর্বে   মন্দিরটিতে  টেরাকোটা  কারুকার্য  ছিল।  সংস্কারের  সময়  এই  কাজ  অপসারিত  হয়েছে।  তবে  সামান্য  একটু  কাজ  এখনও  অবশিষ্ট  আছে।  মন্দিরটিতে  প্রতিষ্ঠাকালীন  একটি  প্রতিষ্ঠাফলক  থাকলেও  তাতে  প্রতিষ্ঠা-সালটির  শেষ  দুটি  অঙ্ক  অনুপস্থিত।  

            গর্ভগৃহে  কাঠের  সিংহাসনে  শ্রীশ্রী  রঘুনাথ  জিউ   ও  রাধিকা  বিগ্রহ  নিত্য  পূজিত। 



শ্রীশ্রী রঘুনাথ  জিউর  মন্দির 

মন্দিরের  শিখরদেশ 

টেরাকোটা  কাজ  সহ  প্রতিষ্ঠাফলক 

প্রতিষ্ঠাফলক

শ্রীশ্রী রঘুনাথ  জিউ  ও  রাধিকা  বিগ্রহ 

            বাকসার  অপর  উল্লেখযোগ্য  পুরাকীর্তি  দ্বাদশ  শিবমন্দির।  স্থানীয়রা  বলেন  বারোমন্দির।  দেওয়ান  ভবানীচরণ  মিত্র  ১৭৮০  খ্রীষ্টাব্দে  মন্দিরগুলি  প্রতিষ্ঠা  করেন।  ছয়টি  করে  দুটি  সারিতে  মন্দিরগুলি  অবস্থিত।  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  স্থাপিত  মন্দিরগুলি  আটচালা  শৈলীর।  প্রতিটি  মন্দিরের  উচ্চতা  ৬০  ফুট (  প্রায়  ১৮  মিটার ) ।  সামনে  উঁচু  রোয়াক  দ্বারা  মন্দিরগুলি  সংযুক্ত।  চৈত্র  মাসের  সংক্রান্তির  দিন  মন্দির  প্রাঙ্গণে  মেলা  বসে। 


এক  সারিতে  ছয়টি  শিবমন্দির 

            ভবানীচরণ  মিত্র  দ্বাদশ  শিবমন্দির  ছাড়াও  আরও  ছয়টি  আটচালা  শিবমন্দির  প্রতিষ্ঠা  করেন।  দুটি  করে  তিনটি  বিভিন্ন  স্থানে  মন্দিরগুলি  অবস্থিত।

            বাকসার  মন্দিরগুলিতে  যেতে  হলে  হাওড়া  থেকে  হাওড়া-কর্ড  লাইনের  ট্রেন  ধরুন।  নামুন  জনাই  রোড  স্টেশন।  স্টেশন  থেকে  মশাট  গামী  অটোতে  উঠে  বাকসা  ষষ্ঠীতলায়  নামুন।  সেখান  থেকে  হেঁটে  মন্দির।  প্রথমে  দ্বাদশ  শিবমন্দির  পড়বে।  তারপর  রঘুনাথ  মন্দির।   

  সহায়ক  গ্রন্থ :

                 ১)  হুগলি  জেলার  ইতিহাস  ও  বঙ্গসমাজ ( ২ য়  খণ্ড ) :  সুধীর  কুমার  মিত্র                    

            

Tuesday, March 28, 2017

Gopinath and Shib Temple, Belmuri, Hooghly, West Bengal


গোপীনাথ  ও  শিব  মন্দির,  বেলমুড়ি,  হুগলি 

                           শ্যামল  কুমার  ঘোষ 

            হাওড়া-বর্ধমান  কর্ড  লাইনে  বেলমুড়ি  একটি  রেলস্টেশন।  হাওড়া  থেকে  বেলমুড়ি  পঞ্চদশ  রেলস্টেশন।  রেলপথে  হাওড়া  থেকে  দূরত্ব  ৪৬.৪  কিমি।

            বেলমুড়ির  পূর্ব  নাম  ছিল  কৃষ্ণরামবাটি।  কিংবদন্তি  যে  মহানাদ  থেকে  মুসলমানদের  অত্যাচারে  উৎপীড়িত  হয়ে  বসুবংশের  তিন  ভ্রাতা  রাজারাম  বসু ,  বিশ্বেশ্বর  বসু  ও  কামদেব  বসু  বেলমুড়িতে  চলে  আসেন।  তাঁরা  এখানে  এসে  গ্রামের  উন্নতিতে  মনোনিবেশ  করেন।  বিশ্বেশ্বর  বসুর  পুত্র  প্রীতরাম  ওরফে  চিন্তামণি  বেলমুড়িতে   যাবতীয়  দেবালয়  স্থাপন  করেন।  বসুবংশের  কুলদেবতা  গোপীনাথ  জিউর  প্রথম  মন্দিরটি  তিনিই  প্রতিষ্ঠা  করেন।  মূল  মন্দিরটি  বিনষ্ট  হয়ে  গেল  তাঁরই  বংশধর  বৈকুণ্ঠদাস  বসু  ১৮৫৫  খ্রীষ্টাব্দে  মন্দিরটি  পুনর্নির্মাণ  করে  দেন।  মন্দিরটি  সমতল  ছাদযুক্ত  একটি  দালান।  ছাদের  সামনের  দিকের  মাঝখানে  একটি  শিখর  বর্তমান।  এখানে  উল্লেখ্য,  প্রীতরাম  বসু  বর্ধমান  রাজের  একজন  উচ্চপদস্থ  কর্মচারী  ছিলেন।


গোপীনাথের  মন্দির,  বেলমুড়ি 

            বেলমুড়ির  গ্রন্থাগারের  কাছে  দুটি  আটচালা  শিবমন্দির  আছে।  শোনা  যায়,  এখানে  দ্বাদশ  শিবমন্দির  ছিল।  এখন  তার  দুটি  অবশিষ্ট  আছে।  একটি  পূর্বমুখী  ও  অন্যটি  পশ্চিমমুখী।   পশ্চিমমুখী  মন্দিরটির  টেরাকোটা  সংস্কারের  সময়  অপসারিত  হয়েছে।  পূর্বমুখী  মন্দিরটির  টেরাকোটা  এখনও  ভালই  আছে।  যদিও  মন্দিরটিতে  অযত্নের  ছাপ  রয়েছে।  

               
শিবমন্দির,  বেলমুড়ি 

মন্দিরের  সামনের  বিন্যাস 

খিলানের  উপরের  কাজ 

তিনটি  টেরাকোটার  ফুল 

 টেরাকোটার  ফুল ( বড়  করে )

            বেলমুড়ির  উপরোক্ত  মন্দিরগুলিতে  যেতে  হলে  হাওড়া  থেকে  হাওড়া-কর্ড  লাইনের  ট্রেন  ধরুন।  নামুন  বেলমুড়ি    স্টেশনে।  স্টেশনের  দক্ষিণ  থেকে  বাস  বা  টোটোতে  উঠুন।   নামুন  স্কুল  মোড়ে।  সেখান  থেকে  ডান  দিকের  রাস্তা  ধরে  গেলে প্রথমে  পাঠাগারের  কাছে  পাবেন  দুটি  মন্দির।  আরও  এগিয়ে  গেলে  পাবেন  গোপীনাথ  মন্দির।    


 সহায়ক  গ্রন্থ :

                 ১)  হুগলি  জেলার  ইতিহাস  ও  বঙ্গসমাজ ( ২ য়  খণ্ড ) :  সুধীর  কুমার  মিত্র

Shib Temple, Bagnan Chaitanyabati, Hooghly



     শিব  মন্দির,  বাগনান  চৈতন্যবাটি,  হুগলি  
         শ্যামল  কুমার  ঘোষ 

            হাওড়া-বর্ধমান  কর্ড  লাইনে  বেলমুড়ি  একটি  রেলস্টেশন।  হাওড়া  থেকে  বেলমুড়ি  পঞ্চদশ  রেলস্টেশন।  রেলপথে  হাওড়া  থেকে  দূরত্ব  ৪৬.৪  কিমি।  বেলমুড়ি  স্টেশনের  দেড়  কিমি  দূরের  গ্রাম  বাগনান  চৈতন্যবাটি।  এখানে  স্থানীয়  বিশ্বাস  বংশ  কর্তৃক  ১৭১৮  শকাব্দে  প্রতিষ্ঠিত  একটি  শিবমন্দির  আছে।  হুগলি  জেলার  পুরাকীর্তি  গ্রন্থে  এটি  ১৭১৮  খ্রীষ্টাব্দ  বলে  উল্লেখ  করা  হয়েছে।  মন্দিরে  একটি  প্রতিষ্ঠা-ফলক  বর্তমান।  এই  বিশ্বাস  পরিবার  এখন  আর  এখানে  থাকেন  না।

            মন্দিরটি  অল্প  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  প্রতিষ্ঠিত,  পূর্ব  মুখী,  একদ্বারবিশিষ্ট  ও  আটচালা  শৈলীর।  মন্দিরের  সামনের  দেওয়াল  টেরাকোটা  অলংকরণে  অলংকৃত।  যদিও  সেই  টেরাকোটার  অনেক  ফলক  নষ্ট  হয়ে  গেছে।  যা  অবশিষ্ট  আছে  তাও  সংস্কারের  সময়  রঙের  প্রলেপ  দেওয়ায়  অনেকটাই  আজ  ম্লান। মন্দিরটি  অজয়  কুমার  মুখার্জী,  তারক  নাথ  দে  ও  শীতল  চন্দ্র  বিশ্বাস  কর্তৃক  বাং  ১৪১১  সালে  সংস্কার  করা  হয়।  মন্দিরের গর্ভগৃহের  সামনে  পত্রাকৃতি  খিলান।   খিলানের  উপরে  ফুল  ও  লতাপাতার  কাজ।  মন্দিরে  মৃৎফলকের  কয়েকটি  সুন্দর  বড়  ফুল  ও  কুলুঙ্গির  মধ্যে  কয়েকটি  মূর্তি  ও  নকশা  বর্তমান।  ভিত্তিবেদি  সংলগ্ন  টেরাকোটার  নকশাগুলিও  সুন্দর।  গর্ভগৃহে  কাল  কষ্টিপাথরের  শিবলিঙ্গ  নিত্য  পূজিত।


  
শিবমন্দির 

মন্দিরের  সামনের  বিন্যাস 

মন্দিরের  সামনের  বিন্যাস ( বড়  করে )

খিলানের  উপরের  কাজ 

খিলানের  উপরের  কাজ ( বড়  করে )

মন্দিরের  প্রতিষ্ঠা-ফলক 

মন্দিরের  এক  দিকের  কোনাচ 

মন্দিরের  আর  এক  দিকের  কোনাচ 
কুলুঙ্গির  মধ্যের  কাজ - ১

কুলুঙ্গির  মধ্যের  কাজ - ২

ভিত্তিবেদি  সংলগ্ন  নকশা - ১

ভিত্তিবেদি  সংলগ্ন  নকশা - ২

কষ্টিপাথরের  শিবলিঙ্গ 

            এই  মন্দিরের  কিছুটা  উত্তরে  স্থানীয়  বসু  পরিবার  কর্তৃক  প্রতিষ্ঠিত  একটি   পঞ্চরত্ন  শিবমন্দির  বর্তমান।  মন্দিরটি  সামান্য  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  প্রতিষ্ঠিত,  পূর্ব  মুখী  ও  একদ্বারবিশিষ্ট।  এর  ছাদের  চারকোণে  চারটি  চূড়া  এবং  মাঝখানে  অপেক্ষাকৃত  বড়  একটি  চূড়া।  মন্দিরের  সামনের  দেওয়াল  টেরাকোটা  অলংকরণে  অলংকৃত।  যদিও  সেই  টেরাকোটার  অনেক  ফলক  নষ্ট  হয়ে  গেছে।  যা  অবশিষ্ট  আছে  তাও  সংস্কারের  সময়  রঙের  প্রলেপ  দেওয়ায়  অনেকটাই  ম্লান।  মন্দিরের গর্ভগৃহের  সামনে  পত্রাকৃতি  খিলান।   খিলানের  উপরে  আটটি  প্রতীক  শিবালয়  ও  তার  মধ্যে  শিবলিঙ্গ।  মন্দিরে  কুলুঙ্গির  মধ্যে  টেরাকোটার  কয়েকটি  মূর্তি বর্তমান।  এ  ছাড়া  টেরাকোটা  নকশাও  আছে।   মন্দিরের  দক্ষিণ  দিকের  দেওয়ালে  একটি  মাত্র  টেরাকোটা  ফলক  বর্তমান  এবং  সেটি  মিথুন  মূর্তি।  মন্দিরের  গর্ভগৃহে  কাল  পাথরের  শিবলিঙ্গ  নিত্য  পূজিত।


পঞ্চরত্ন  শিবমন্দির 

মন্দিরের  সামনের  বিন্যাস 

খিলানের  উপরের  কাজ 

মিথুন  মূর্তি 

কুলুঙ্গির  মধ্যের  মূর্তি - ১

কুলুঙ্গির  মধ্যের  মূর্তি - ২

কুলুঙ্গির  মধ্যের  মূর্তি - ৩

কুলুঙ্গির  মধ্যের  মূর্তি - ৪

মন্দিরের  কোনাচ 

            এই  মন্দিরের  বিপরীতে  বসু  পরিবার  কর্তৃক  প্রতিষ্ঠিত  আর  একটি  পশ্চিম  মুখী,  পঞ্চরত্ন  মন্দির  বর্তমান। মন্দিরটি  বর্তমানে  ভগ্ন  ও  পরিত্যক্ত।  এর  সামনের  দেওয়ালে  যেটুকু  টেরাকোটা  অলংকরণ  এখনও  অবশিষ্ট  আছে  তা  থেকে  বোঝা  যায়  যে  এই  টেরাকোটা  খুবই  উন্নতমানের।


পরিত্যক্ত  পঞ্চরত্ন  শিবমন্দির 

মন্দিরের  খিলানের  উপরের  কাজ 

মন্দিরের  খিলানের  উপরের  কাজ ( বড়  করে )

ভিত্তিবেদি  সংলগ্ন  টেরাকোটা  ফলক 

মন্দিরে  টেরাকোটা  নকশা - ১ 

মন্দিরে  টেরাকোটা  নকশা - ২

মন্দিরে  টেরাকোটা  মূর্তি - ১

মন্দিরে  টেরাকোটা  মূর্তি - ২


            এছাড়া  এখানে  আগে  ঘোষ  বংশ  প্রতিষ্ঠিত  দ্বাদশ  শিবের  মন্দির  ছিল।  এই  মন্দিরগুলির  একটি  ছাড়া  সবগুলিই  ভূমিসাৎ  হয়ে  গেছে।  যে  মন্দিরটি  অবশিষ্ট  আছে  তাও  এখন  ভগ্ন  ও  পরিত্যক্ত।  মন্দিরগুলির  শিবলিঙ্গগুলি  বর্তমানে  একটি  নতুন  তৈরি  দালান-গৃহে  নিত্য  পূজিত  হচ্ছেন। 


পরিত্যক্ত  শিবমন্দির 

পরিত্যক্ত  শিবমন্দিরের  খিলানের  উপরের  কাজ 

দ্বাদশ  শিবমন্দিরের  কয়েকটি  শিবলিঙ্গ 
     

            বাগনান  চৈতন্যবাটির  উপরোক্ত  মন্দিরগুলিতে  যেতে  হলে  হাওড়া  থেকে  হাওড়া-কর্ড  লাইনের  ট্রেন  ধরুন।  নামুন  বেলমুড়ি  স্টেশনে।  স্টেশনের  উত্তর  দিক  থেকে  রিকশায়  বা  হেঁটে  পৌঁছে  যান  বাগনান  চৈতন্যবাটি। 

                 
   সহায়ক  গ্রন্থ
             ১)  হুগলি  জেলার  পুরাকীর্তি : নরেন্দ্রনাথ  ভট্টাচার্য 

            

Radhagobinda Temple and Shib Temple, Gurbari, Jerul, Chopa and Moubeshia, Hooghly


রাধাগোবিন্দ  ও  অন্যান্য  মন্দির,  গুড়বাড়ি,  জেরুল,  চোপা  এবং  মৌবেশিয়া,  হুগলি 

                                 শ্যামল  কুমার  ঘোষ 

            হাওড়া-বর্ধমান  কর্ড  লাইনে  গুড়াপ  একটি  রেলস্টেশন।  হাওড়া  থেকে  গুড়াপ   ১৮  তম  রেলস্টেশন।  রেলপথে  হাওড়া  থেকে  দূরত্ব  ৫৭.৪  কিমি।  গুড়াপ-দশঘরা  বাস  রাস্তায় মৌবেশিয়া  বা  মৌবেশ  একটি  গ্রাম।  গুড়াপ  থেকে  দূরত্ব  ৬  কিমি।  মৌবেশ মোড়  থেকে  মৌবেশ,  চোপা,  গুড়বাড়ি  ও  জেরুল,  এই  চারটি গ্রামের  মন্দিরগুলি  আজ  আমরা  দেখব।  মৌবেশ  মোড়  থেকে  যে  দিকে  মৌবেশ  গ্রাম  তার  বিপরীত  দিকের  রাস্তার  ২  কিমি  দূরের  গ্ৰাম  গুরবাড়ি।  এই  রাস্তা  ধরে  এগুলে  কিছুটা  দূরে  ডান  দিকে  একটি  রাস্তা  চলে  গেছে।  এই  রাস্তায়  কিছুটা  গেলে  পড়বে  চোপা  গ্রাম।  এখন চোপা  গ্রামে  না  গিয়ে  সোজা  চলুন  গুড়বাড়ি।  

    গুড়বাড়ি 

            গুড়বাড়ি  গ্রামে  শ্রীশ্রী  রাধাগোবিন্দ  জিউর  বিরাট  মন্দির  ও  দোলমঞ্চ  খুবই  দর্শনীয়।  ১৭১১  শকাব্দে ( ১৭৮৯ খ্রীষ্টাব্দে )  রামনারায়ণ  চৌধুরী  এই  দুটি  প্রতিষ্ঠা  করেন।  বীরভূম  জেলার  কেন্দুবিল্বের  নিকট  সেনপাহাড়ি  গ্রাম  থেকে  এঁরা  এখানে  এসেছিলেন। এই  বংশের  নিধিরাম  রায়  সম্রাট  আকবরের  কাছ  থেকে  চৌধুরী  উপাধি  পান।  তিনি  চার-পাঁচটি  ভাষায়  পারদর্শী  ছিলেন।  তিনি  প্রভূত  সম্পত্তি  রেখে  যান।  রায়চৌধুরীদের  দুটি  বাড়িতে  দুটি  মন্দির।  বড়  বাড়িতে  রামনারায়ণ  প্রতিষ্ঠিত  রাধাগোবিন্দ  ও  ছোট  বাড়িতে  ইন্দ্রনারায়ণ  প্রতিষ্ঠিত  লক্ষ্মীনারায়ণের  মন্দির।  'টেকনো  ইণ্ডিয়া'র  সত্তম  রায়চৌধুরী  ছোট  বাড়ির  বংশধর।  তিনি  লক্ষ্মীনারায়ণের  মন্দির  নতুন  করে  নির্মাণ  করে  দিয়েছেন।  আমার  পরিদর্শনের  সময়  মন্দির  বন্ধ  থাকায়  ছবি  তোলা  সম্ভব  হয়  নি। 

            রাধাগোবিন্দের  মন্দির  পাঁচ  খিলান  বিশিষ্ট  একটি  দালান।  মন্দিরটি  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  স্থাপিত।  মন্দিরের  উপরে  একটি  শিখর  আছে।  মন্দিরে  ওঠার  দুদিকে  দুটি  সিঁড়ি।  গর্ভগৃহের  সামনে  একটি  একটি  ঢাকা  বারান্দা  এবং  তার  সামনে  আছে  একটি  রোয়াক।  গর্ভগৃহে  ঢোকার  একটিই  দরজা।  গর্ভগৃহের  সামনের  দেওয়ালে  একটি  প্রতিষ্ঠাফলক  আছে।   গর্ভগৃহে  গোবিন্দ  ও  রাধিকা  বিগ্রহ  নিত্য  পূজিত।  ১৪০২  সালের  ৯ ই  ফাল্গুন  রাধাগোবিন্দ  মন্দির  ও  বিগ্রহের  ভার  'ওঙ্কার  সেবক  সঙ্গে'র  হাতে  অর্পণ  করা  হয়।  ১৪০৬ সালে  'ওঙ্কার  সেবক  সঙ্গে'র  পক্ষ  থেকে  মন্দিরটি  সংস্কার  করা  হয়।


রাধাগোবিন্দ  মন্দির 

মন্দিরের  শিখরদেশ 

মন্দিরের  প্রতিষ্ঠাফলক 

রাধাগোবিন্দ-রাধিকা  বিগ্রহ  ও  অন্যান্য  চিত্র 

রাধাগোবিন্দ  ও  রাধিকা  বিগ্রহ 

            এই  দালানবাড়ির  বাইরে  আছে  দুটি  আটচালা  শিবমন্দির।  একটি  শিবমন্দিরের  সংস্কার  করার  সময়  'টেরাকোটা'  অপসারিত  হয়েছে।  অপরটি  এখনও  ভগ্নাবস্থায়।  মন্দিরের  সামনের  দেওয়ালে  সামান্য  টেরাকোটার  অলংকার  বর্তমান।  গর্ভগৃহে  কাল  পাথরের  শিবলিঙ্গ  নিত্য  পূজিত।


শিবমন্দির 

খিলানের  উপরের  কাজ 

            পাশেই  রাধাগোবিন্দের  দোলমঞ্চ।  এই  দোলমঞ্চ  সম্বন্ধে  অন্যত্র  আলোচনা  করবো। 

        জেরুল 
         
            গুড়বাড়ি  থেকে  আরও  ১ কিমি  দূরে  জেরুল  গ্রাম।  এই  গ্রামে  ঊনিশ  শতকে  নির্মিত  স্থানীয়  বন্দোপাধ্যায়  বংশ  প্রতিষ্ঠিত  একটি  আটচালা  শিবমন্দির  আছে।  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  স্থাপিত,  দক্ষিণমুখী  মন্দিরটির  সামনের  দেওয়ালে  সামান্য  টেরাকোটা  অলংকরণ  আছে।  কিন্তু  সংস্কারের  সময়  রঙের  প্রলেপে  সেই  'টেরাকোটা'র  অনেকটাই  আজ  ম্লান।  গর্ভগৃহে  কাল  পাথরের  শিবলিঙ্গ  নিত্য  পূজিত।



শিবমন্দির,  জেরুল 

মন্দিরের  সামনের  বিন্যাস 

খিলানের  উপরের  কাজ 

ভিত্তিবেদি  সংলগ্ন  'টেরাকোটা'র  কাজ 
              
            এবার  ফিরতি  পথে  চলুন  যাই  চোপা  গ্রামে।   
             
            চোপা 

            এই  গ্রামের  ব্রাহ্মণ  পাড়ায়  স্থানীয়  মুখোপাধ্যায়  বংশের  প্রতিষ্ঠিত  ঢাকেশ্বরী  মন্দির  ও  দুটি  শিবমন্দির  আছে।  এছাড়া  পাশেই  দু-তিনটি  ভগ্ন  শিবমন্দির  আছে।     

            আরও  এগুলে  স্থানীয়  স্কুলের  কাছে  মজুমদার  বংশের  রামদেব  প্রতিষ্ঠিত  গোপীনাথের  মন্দির  আছে।  গোপীনাথ  মন্দিরের  কাছে  মজুমদারদের  প্রতিষ্ঠিত  একটি  আটচালা  শিবমন্দির  বর্তমান।  কয়েকবার  সংস্কৃত  মন্দিরটির  খিলানের  উপরে  'টেরাকোটা'র  কাজ  বর্তমান।  গর্ভগৃহে  কাল  পাথরের  শিবলিঙ্গ  নিত্য  পূজিত।



আটচালা  শিবমন্দির 

খিলানের  উপরের  কাজ 


            এই  মন্দির  থেকে  আরও  খানিকটা  এগুলে  বাঁশঝাড়ের  মধ্যে  মজুমদারদের  দুটি  পরিত্যক্ত  পঞ্চরত্ন  মন্দির  চোখে  পড়বে।  এর  একটিতে  এখনও  'টেরাকোটা'র   কাজ  বর্তমান।   

 
পরিত্যক্ত  পঞ্চরত্ন  মন্দির 


মন্দিরের  খিলানের  উপরের  কাজ 

মন্দিরের  একদিকের  কোনাচ 

মন্দিরের  আর  একদিকের  কোনাচ 
      
            চোপা  গ্রাম  থেকে  এবার  ফিরে  চুলুন  মৌবেশ  মোড়ে।  সেখান  থেকে  বাঁ  দিকের  রাস্তা  ধরে  একটু  এগুলেই  মৌবেশিয়া  বা  মৌবেশ  গ্রাম।     


        মৌবেশিয়া / মৌবেশ 

            এই  গ্রামে   ঘোষবংশ  প্রতিষ্ঠিত  ঊনবিংশ  শতাব্দির  মধ্যভাগে  নির্মিত  একটি  আটচালা  শিবমন্দির  আছে।  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  স্থাপিত  মন্দিরটি  পশ্চিমমুখী।  মন্দিরটির  সামনের  দেওয়ালে  খিলানের  উপর  'টেরাকোটা'  অলংকরণ  আছে।  কিন্তু  সংস্কারের  সময়  রঙের  প্রলেপে  সেই  'টেরাকোটা'  অনেকটাই  ম্লান।  গর্ভগৃহে  কাল  পাথরের  শিবলিঙ্গ  নিত্য  পূজিত।  



শিবমন্দির,  মৌবেশ 

মন্দিরের  সামনের  বিন্যাস 

খিলানের  উপরের  কাজ 

শিবলিঙ্গ 

            উপরোক্ত  মন্দিরগুলিতে  যেতে  হলে  হাওড়া  থেকে  কর্ড  লাইনের  বর্ধমান  লোকাল  ধরুন।  নামুন  গুড়াপ  স্টেশনে।  স্টেশন  থেকে  দশঘরা  গামী  ট্রেকারে  উঠুন।  নামুন  মৌবেশিয়া  বা  মৌবেশ।  সেখান  থেকে  টোটো  বা  রিকশায়  মন্দিরগুলো  দেখে  নিন। 


 সহায়ক  গ্রন্থাবলী :
         ১)  হুগলি  জেলার  পুরাকীর্তি :  নরেন্দ্রনাথ  ভট্টাচার্য 
        )  হুগলি  জেলার  দেব  দেউল  :  সুধীর  কুমার  মিত্র