Thursday, September 22, 2016

Shri Adwaita Pat, Babla, Santipur, Nadia


শ্রী অদ্বৈত  পাট,  বাবলা,  শান্তিপুর,  নদিয়া

                                        শ্যামল  কুমার  ঘোষ 

             ১৪৩৪  খ্রীষ্টাব্দে  শ্রী অদ্বৈতাচার্য  শ্রীহট্টের  অন্তর্গত  লাউড়  পরগণার  নবগ্রাম  নামক  পল্লীতে  জন্মগ্রহণ  করেন ।  তাঁর  পিতার  নাম  কুবের  মিশ্র,  মাতা  লাভা  দেবী ।  কুবের  আচার্য  লাউড়ের  রাজা  দিব্যসুন্দরের  সভাপণ্ডিত  ছিলেন ।  অদ্বৈতাচার্য়ের  বাল্যকালের  নাম  কমলাক্ষ ।  বার  বছর  বয়সে  তিনি  শান্তিপুরে  আসেন  স্মৃতি  শাস্ত্র  ও  ন্যায়  শাস্ত্র  পড়ার  জন্য ।  শান্তিপুরের  অন্তর্গত  পূর্ণবাটী  নিবাসী  শান্ত  বেদান্তবাগীশ  নামক  জনৈক  অধ্যাপকের  কাছে  বেদচতুষ্টয়  অধ্যয়ন  করে  তিনি  'বেদ  পঞ্চানন'  ও  'অদ্বৈতাচার্য'  উপাধি  লাভ  করেন ।  বিদ্যাশিক্ষা  শেষ  করে  তিনি  স্থায়ীভাবে  শান্তিপুরে  বসবাস  করতে  মনস্ত  করেন ।  বৈষ্ণবদের  কাছে  তিনি  মহাবিষ্ণু  বা  শিবের  অবতার  রূপে  পূজিত  হন ।

            শান্তিপুরের  কাছে  বাবলা  নামক  স্থানে  আম  বাগানের  মধ্যে  শ্রীঅদ্বৈত  পাট  অবস্থিত ।  যদিও  এই  স্থান  নিয়ে  মতভেদ  আছে ।  এই  অদ্বৈত  পাট  সমগ্র  বৈষ্ণবমণ্ডলীর   পরম  তীর্থক্ষেত্র ।  এই  পবিত্র  ক্ষেত্রে  শ্রীঅদ্বৈতাচার্য  জীবের  দুঃখ-কষ্ট   মোচনের  জন্য  কঠোর  তপস্যায়  ভগবানের  আরাধনা  করেছিলেন ।  জনশ্রুতি,  এই  আরাধনা  ক্ষেত্রেই  শচীমাতা  তাঁদের  পরম  পূজ্যপাদ  গুরুদেব  শ্রীঅদ্বৈত  প্রভুর  আশীর্বাদপূত  তুলসীমঞ্জরী  সেবনেই  শ্রীশ্রীগৌরাঙ্গসুন্দরকে  গর্ভে  ধারণ  করেছিলেন ।  চৈতন্যদেব  যখন  জন্মগ্রহণ  করেন  তখন  অদ্বৈতাচার্য়ের  বয়স  ৫২  বৎসর ।  তিনি  ১২৫  বছর  বেঁচেছিলেন ।

            বাবলা  শ্রীপাট  সেই  পবিত্র  স্থান  যেখানে  ঘটেছিল  গৌরাঙ্গ,  নিত্যানন্দ  ও  অদ্বৈতের  মহামিলন ।  সন্ন্যাস  গ্রহণের  পর  এই  অদ্বৈত  ভবনে  মহাপ্রভু  দশ  দিন  অবস্থান  করেন ।  এখানেই  শচীমাতা  প্রাণের  দুলাল  সন্ন্যাসীবেশী  গৌরসুন্দরকে   নিজের  হাতে  রান্না  করে  আহার  করান ।  এখানেই  গৌরাঙ্গ  অদ্বৈতাচার্য়ের  কাছে  শ্রীমদ্ভাগবত  ও  বেদশাস্ত্র  অধ্যয়ন করে  'বিদ্যাসাগর'  উপাধি  লাভ  করেন ।  এই  পবিত্র  ক্ষেত্রেই  ব্রজকল্পতরু  মাধবেন্দ্র  পুরী  অদ্বৈতাচার্যকে  দীক্ষা  দান  করেন ।  শ্রীহরিদাসের  অদ্বৈতপ্রভুর  কাছে  দীক্ষালাভ  এই  আশ্রম  ভূমিতেই ।  এই  স্থানেই  লাউড়ের  রাজা  দিব্যসিংহ  শাক্ত  ধর্ম  ত্যাগ  করে   অদ্বৈতাচার্য়ের  শিষ্য  হন  এবং  'লাউড়িয়া  কৃষ্ণদাস'  নামে  পরিচিত  হন । 

            শ্রীঅদ্বৈতপ্রভুর  প্রকটাবস্তায়  গঙ্গা  বাবলা  শ্রীপাটের  পাশ  দিয়ে  বইত ।  কালক্রমে  গঙ্গা  দূরে  সরে  যাওয়ায়  শান্তিপুর  গ্রামও  এই  স্থান  থেকে  দূরে  স্থাপিত  হয়  এবং  অদ্বৈতের  বংশধরেরা  বহু  পরিবারে  বিভক্ত  হয়ে  শহরের  বিভিন্ন  স্থানে  নিজের  নিজের  সুবিধামত  বাসস্থান  নির্মাণ  করে,  বিগ্রহ  স্থাপন  করে  বসবাস  করতে  থাকে।  এই  শ্রীপাট  ক্রমে  জঙ্গলাকীর্ণ  হয়ে  পড়ে  এবং  সংস্কারাভাবে  আশ্রমটি  ধ্বংস  হয়ে  যায় ।
      
            সাধু  সীতানাথ  দাস  নামক  শ্রীসম্প্রদায়ী  এক  বৈষ্ণব  স্বপ্নাদেশে  এই  বৈষ্ণব  তীর্থকে  পুনরুদ্ধার  করেন  এবং  ভিক্ষালব্ধ  অর্থ  দ্বারা  মন্দির  নির্মাণ  করে  শ্রীঅদ্বৈত  প্রভুর  দারুময়  মূর্তি,  শ্রীশ্রী  রাধাকৃষ্ণ  মূর্তি,  শ্রী  গোপাল  জিউ  মূর্তি,  শ্রীবিষ্ণুনারায়ণ  শিলা  প্রভৃতি  প্রতিষ্ঠা  করে  নিত্য  সেবা  করতে  থাকেন।  কথিত  আছে  যে  অদ্বৈতাচার্যের  বংশধর  প্রভুপাদ  বিজয়কৃষ্ণ  গোস্বামী  একদা  হরিসংকীর্তনের  দল  নিয়ে  সংকীর্তন  করতে  করতে  বাবলার  শ্রীপাটে  এলে  একটি  কুকুরের  ( ভক্তরাজ  কেলে )  ইঙ্গিতে  একটি  নির্দিষ্ট  স্থান  খনন  করলে  শ্রীঅদ্বৈত  প্রভুর  কমলাক্ষ  নামাঙ্কিত  কাষ্ঠ  পাদুকা  ও  কমণ্ডলু  উদ্ধার  করেন।  সীতানাথ  দাস  বাবাজির  মৃত্যুর  পর  নারায়ণ  দাস  বাবাজি,  রাজকুমার  রায়  ও  সীতানাথ  গোস্বামী  সেবার  ভারপ্রাপ্ত  হন।  সীতানাথ  সেবাসমিতির  হাতে  সেবার  ভার  দেন।  তিনি  সম্পাদক  এবং  রায়  নগেন্দ্রনাথ  মুখোপাধ্যায়  বাহাদুর  সভাপতি  থাকেন।  এরমধ্যে  শান্তিপুরের  কতিপয়  প্রসিদ্ধ  ব্যক্তির  স্বাক্ষর  সম্বলিত  পত্রের  দ্বারা  ক্ষমতাপ্রাপ্ত  হয়ে  শ্রীনিকুঞ্জমোহন  গোস্বামী  মন্দিরের  পুনঃসংস্কার  কার্যে  নিযুক্ত  হন  এবং  সেবাদিও  চালাতে  থাকেন।  এমন  সময়  বিরোধের  সৃষ্টি  হয়  এবং  মামলা  হয়।  একটি  সভায়  কয়েকটি  কারণে  তাঁকে  বর্জনের  প্রস্তাব  করে  শ্রী  রামচন্দ্র  গোস্বামী,  শ্রী  মানগোবিন্দ  গোস্বামী  ও  সীতানাথ  গোস্বামীর  মধ্যম  পুত্র  শান্তিসুধাকে  সভ্য  করে  শেষোক্ত কে  সেবায়েত  নিযুক্ত  করা  হয়।  বর্তমানে  শ্রীঅদ্বৈত  পাটের  সেবায়েত  শ্রী  প্রশান্ত  গোস্বামী।     

            সাধু  সীতানাথ  দাস  শ্রীঅদ্বৈতাচার্যের  যে  মন্দির  নির্মাণ  করেন  সে  মন্দির  ভেঙে  পড়ায়  শ্রীবিজয়কৃষ্ণ  গোস্বামীর  শিষ্যরা  বর্তমান  দালান  মন্দিরটি  ১৩৪৯  সনের  ১৬ ই  বৈশাখ  পুননির্মাণ  করে  দেন।  মন্দিরের  ভিতর   শ্রীঅদ্বৈতাচার্যের  সুন্দর  দারুমূর্তি,  রাধাকৃষ্ণ  ও  নারায়ণ  শিলা  প্রতিষ্ঠিত।  মন্দিরের  সামনে  নাটমন্দির।  মন্দিরের  প্রবেশদ্বার  দিয়ে  ঢুকলে  ডান  দিকে  পাশাপাশি  শ্রীবিজয়কৃষ্ণ  গোস্বামী  ও  হরিদাস  ঠাকুরের  মন্দির।     মন্দিরের  পিছনে  বাঁ  দিকে  তিন  প্রভু  গৌর,  নিতাই  ও  সীতানাথের  বিশ্রামস্থল।  পাশেই  শ্রীপাদ  মাধবেন্দ্রপুরির  মন্দির।  শ্রীঅদ্বৈতপাটে   প্রতি  বছর  মাঘ  মাসের  শুক্লপক্ষের  সপ্তমী  তিথিতে  শ্রীঅদ্বৈত  প্রভুর  আবির্ভাব  দিবস  ও  দোলপূর্ণিমার  পর  সপ্তমী  তিথিতে  দোল  উৎসব  পালন  করা  হয়। 

            বাবলার  শ্রীঅদ্বৈত  পাটে  যেতে  হলে  শিয়ালদহ  থেকে  শান্তিপুর  লোকাল  ধরুন ।  রেলপথে  শান্তিপুরের  দূরত্ব  ৯৩  কিমি।  ট্রেনে  সময়  লাগে  ঘন্টা  আড়াই ।  স্টেশন  থেকে  রিকশায়  বা  টোটোতে  পৌঁছে  যান  বাবলার  শ্রীপাটে।  শহরের  কোলাহল   থেকে  দূরে  আমবাগানের  মধ্যে  অবস্থিত,  শান্ত  পরিবেশের  এই   শ্রীপাট  একদিনের  জন্য  ভালই  লাগবে।
       


পাঁচিল  দিয়ে  ঘেরা  শ্রীঅদ্বৈত  পাট

নাটমন্দির,  শ্রীঅদ্বৈত  পাট

নাটমন্দিরের  ভিতরের  চিত্র,  সামনে  মন্দিরের   দরজা 

নাটমন্দির  ও  মূল  মন্দির 

শ্রীঅদ্বৈত  প্রভুর  বিগ্রহ

শ্রীবিজয়কৃষ্ণ  গোস্বামী  ও  হরিদাস  ঠাকুরের  মন্দির

শ্রীবিজয়কৃষ্ণ  গোস্বামীর  বিগ্রহ

শ্রী  হরিদাস  ঠাকুরের  চিত্র

শ্রীপাদ  মাধবেন্দ্রপুরির  মন্দির  ও  তিন  প্রভুর  বিশ্রামস্থল

শ্রীচৈতন্য  বিগ্রহ
                   
     সহায়ক  গ্রন্থাবলি  :
                          ১)  শ্রীশ্রীঅদ্বৈত  পাট  :  শ্রী  সীতানাথ  গোস্বামী 
                         ২)  শান্তিপুর  পরিচয়  :  শ্রী  কালীকৃষ্ণ  ভট্টাচার্য 
                         ৩)  বাংলায়  ভ্রমণ ( ১ম  খণ্ড ) :  পূর্ববঙ্গ  রেলপথের  প্রচার  হইতে  প্রকাশিত 

Sunday, September 11, 2016

Gopinath Jiu Temple, Agradwip, Bardhaman

     শ্রীগোপীনাথ  জিউ  মন্দির, অগ্রদ্বীপ, বর্ধমান 

 শ্যামল কুমার ঘোষ 

            বর্ধমান  জেলার  কাটোয়া  মহকুমার  অন্তর্গত  ভাগীরথীর বাম  তীরস্থ  একটি  প্রাচীন  গ্রাম  অগ্রদ্বীপ।  কীর্তিনাশিনী  ভাগীরথী বার  বার  গ্রামটিকে  বিধ্বস্থ  করেছে।  তাই  গ্রামটি  কখনও ভাগীরথীর  বাম  তীরে  আবার  কখনও  বা  ডান  তীরে।  পূর্বতন  অগ্রদ্বীপ  বর্তমান  স্থানের  ১.৫  কিমি  উত্তরে  অবস্থিত  ছিল।  গঙ্গার  ভাঙনে  প্রাচীন  গ্রাম  বিলুপ্ত  হওয়ায়  নতুন  করে  গ্রাম  পত্তন  হয়েছে।  হাওড়া  থেকে  হাওড়া-বাণ্ডেল-কাটোয়া  রেলপথে  ১৩১  কিমি  দূরের  একটি রেলস্টেশন  অগ্রদ্বীপ। ( শিয়ালদহ  থেকেও  যাওয়া  যায়।)  গোপীনাথ  মন্দিরে  যেতে  হলে  স্টেশনে নেমে  অটোতে  চেপে  গঙ্গার  ঘাটে  যেতে  হবে।  সময়  লাগবে   মিনিট  পনেরো।  নৌকায়  গঙ্গা  পেরিয়ে  কিছুটা  হাঁটলে অগ্রদ্বীপের  গোপীনাথ  মন্দিরে  পৌঁছে  যাবেন।  শিয়ালদহ-লালগোলা  রেলপথে  বেথুয়াডহরি  স্টেশনে  নেমে  বাসেও  যেতে  পারেন। 

            অগ্রদ্বীপ  কথার  অর্থ,  আগে  বা  প্রথমে  যে  দ্বীপ  জেগে  ওঠে।  ভাগীরথীর  প্রথম  জেগে  ওঠা  দ্বীপ  অগ্রদ্বীপ।  প্রাচীন  কাল  থেকেই  অগ্রদ্বীপ  তীর্থস্থান  বলে  খ্যাত।  দিগ্বিজয়প্রকাশে  লেখা  আছে  যে  বারুণীতে  অগ্রদ্বীপে  গঙ্গা-স্নান  করলে  বারাণসীতে  গঙ্গা-স্নানের  সমান  পুণ্য  লাভ  হয়।  কথিত  আছে,  এখানকার  ফল  মাহাত্মের  জন্য  রাজা  বিক্রমাদিত্য  এখানে  গঙ্গাস্নান  করতে  আসতেন।  অগ্রদ্বীপে  বারুণী  উৎসব  উপলক্ষ্যে  স্নানের  রেওয়াজ  শ্রীগোপীনাথ  জিউ  প্রতিষ্ঠার  আগে  থেকেই।  ঘটনাচক্রে  গোপীনাথজির  প্রতিষ্ঠাতা  ও  প্রথম  সেবায়েত  গোবিন্দ  ঘোষের    তিরোধান  উৎসব  চৈত্র  মাসের  কৃষ্ণা  একাদশী  এবং  ত্রয়োদশীর  বারুণী  স্নানের  সময়ের  ব্যবধান  মাত্র  একদিন। 

            কাটোয়া  শহর  থেকে  ১৬  কিমি  উত্তর-পশ্চিমে  প্রাচীন  কুলাই  গ্রাম।  এই  গ্রামের  উত্তররাঢ়ীয়  কায়স্থ-ঘোষবংশে  গোবিন্দের  জন্ম।  তাঁর  পিতার  নাম  বল্লভ  ঘোষ।  গোবিন্দ  শ্রীচৈতন্যদেবের  অন্যতম  পার্ষদ  ছিলেন।  চৈতন্যদেব  একবার  গোবিন্দ  ঘোষ  ও  আরও  কয়েকজনকে  নিয়ে  বৃন্দাবন  যাওয়ার  পথে  গঙ্গার  ধার  দিয়ে  যেতে  যেতে  একটি  গ্রামের  এক  গৃহস্থ  বাড়িতে  মধ্যাহ্ন  ভোজনের  পর  মুখশুদ্ধি  চাইলে  গোবিন্দ  ঘোষ  এক  বাড়ি  থেকে  একটি  হরীতকী  চেয়ে  এনে  মহাপ্রভুকে  তার  থেকে  এক  টুকরো  দিয়ে  বাকিটুকু  রেখে  দিলেন।  গ্রাম  পরিক্রমাকালে  পরদিন  অগ্রদ্বীপে  এসে  একটি  বাড়িতে  মধ্যাহ্ন  ভোজনের  পর  চৈতন্যদেব  পুনরায়  মুখশুদ্ধি  চাইলে  গোবিন্দ  আগের  দিনের  সঞ্চিত  হরীতকীর  বাকি  অংশটুকু  মহাপ্রভুর  দিকে  এগিয়ে  দিলেন।  মহাপ্রভু  হেঁসে  বললেন,  "গোবিন্দ,  আমার  সঙ্গে  তোমার  যাওয়া  হবে  না।  তোমার  এখনও  বিষয়  বাসনা  যায়  নি।"   এই  কথা  শুনে  গোবিন্দ  অঝোরে  কাঁদতে  কাঁদতে  বললেন,  "প্রভু,  তোমার  সেবা  করব  বলেই  গৃহ  থেকে  বেরিয়েছি,  আমি  তোমাকে  ছেড়ে  কিছুতেই  যাব  না।"  মহাপ্রভু  তাঁকে  বললেন,  "দুঃখ  পেয়ো  না  গোবিন্দ।  তুমি  এখানে  থেকে  গৃহীজীবন-যাপন  কর   এবং  এখানে  এক  বিষ্ণুবিগ্রহ  স্থাপন  করে  তাঁর  সেবা  কর,  তাহলেই   আমার  সেবা  করা  হবে।"  গোবিন্দ  গঙ্গাতীরে  একটা  ছোট্ট  কুটির  তৈরি  করে  সাধন-ভজনে  মন  দিলেন।  পরে  কষ্টিপাথরে  ( মতান্তরে,  ব্রহ্মশিলা )  নির্মিত  গোপীনাথ  বিগ্রহের  প্রতিষ্ঠা  করলেন।  অপরূপ  এই  গোপীনাথ  বিগ্রহ !  মূর্তিটি  ভাস্কর্য  শিল্পের  এক  অনুপম  সৃষ্টি।  মন্দিরের  সামনে  একলা  দাঁড়িয়ে  হঠাৎ  এই  শ্রীমূর্তি  দেখলে  মনে  হয়  যেন  স্বয়ং  গোপীনাথ    বৃন্দাবন  থেকে  অগ্রদ্বীপে  হাজির  হয়েছেন।                

            গোপীনাথ  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠার  পর  ঘোষঠাকুর ( গোবিন্দ  ঘোষ  কে  এই  নামেই  ডাকা  হত )  বহুকাল  জীবিত  ছিলেন।  অগ্রদ্বীপের  নিকটবর্তী  কাশীপুর  বিষ্ণুতলায়  সিংহ-বংশে  তাঁর  বিবাহ  হয়  এবং  বৎসরান্তে  একটি  সন্তানের  জন্ম  দিতে  গিয়ে  তাঁর  স্ত্রীর  মৃত্যু  হয়।  গোবিন্দ  মাতৃহারা  শিশুকে  মানুষ  করতে  থাকেন  এবং  একই  সঙ্গে  পুত্ররূপে  গোপীনাথের  সেবাও  করতে  থাকেন।  পাঁচ  বছর  বয়সে  তাঁর  শিশু  পুত্রটি  মারা  যায়।  গোবিন্দ  শোকে  মুহ্যমান  হয়ে  পড়েন  এবং  মৃত্যু  বরণ  করবেন  বলে  সিদ্ধান্ত  নেন।  কথিত  আছে,  গোপীনাথ  নাকি  তখন  তাঁকে  সান্তনা  দেন  এবং  প্রতিশ্রুতি  দেন  যে  তিনি  স্বয়ং  তাঁর  পুত্রের  করণীয়  কাজগুলি  করবেন।  এমনকি  শ্রাদ্ধশান্তিও।  কোন  এক  বারুণী  উৎসবের  পূর্বে  চৈত্র  মাসের  একাদশী  তিথিতে  ঘোষঠাকুর  ইহলোক  ত্যাগ  করেন।  জনশ্রুতি,  সেদিন  গোপীনাথ  বিগ্রহের  চোখে  বিন্দু  বিন্দু  জল  দেখা  দিয়েছিল।  ঘোষঠাকুরকে  মন্দিরের  পাশে  সমাধি  দেওয়া  হয়।  স্বয়ং  গোপীনাথ  শ্রাদ্ধের  বাস  ও  কুশাঙ্গুরীয়  পরিধান  করে  ঘোষঠাকুরের  শ্রাদ্ধ  করেন।  এখনও  প্রতি  বছর  ওই  তিথিতে  বিগ্রহকে  শ্রাদ্ধের  বসন  পরানো  হয়  এবং  তাঁকে  দিয়ে  পিণ্ড  দান  করানো  হয়।

            অন্য  মতে,  মহাপ্রভুর  আদেশে  গোপীনাথ  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠার   আগেই  গোবিন্দ্র  ঘোষ  বিবাহিত  ছিলেন।  তাঁর  একটি  পুত্র  সন্তানও  জন্মেছিল। অকালে  পুত্রটি  মারা  গেলে  তিনি  শোকে  মুহ্যমান  হয়ে  পড়েন  এবং  সংসারের  প্রতি  তাঁর  বৈরাগ্য  আসে।  এই  সময়  তিনি  মহাপ্রভুর  কৃপা  লাভ  করেন।  গোপীনাথ  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠার  পর  গোবিন্দ  গোপীনাথের  মধ্যেই  নিজের  পুত্রকে  দেখতে  পান  এবং  পুত্র  বাৎসল্যে  গোপীনাথের  সেবা  করতে  থাকেন। তাঁর  অপ্রকট-কাল  উপস্থিত  হলে  তিনি  শিষ্যদের  বলে  যান  যে  স্বয়ং  গোপীনাথই  তাঁর  শ্রাদ্ধাদি  কার্য  সম্পন্ন  করবেন।  শিষ্যরা  ঘোষঠাকুরের  আদেশ  ভক্তিভরে  পালন  করেন  এবং  কালক্রমে  তা  প্রথা  হয়ে  দাঁড়ায়  যা  এখনও  চলে  আসছে।                        
         
            গোবিন্দ  ঘোষের  তিরোধানের  পর  তাঁর  শিষ্য  ও  ভক্তগণের  প্রচেষ্টায়  গোপীনাথ  বিগ্রহের  খ্যাতি  চারিদিকে  ছড়িয়ে  পড়ে।  বহু  দূরদেশ  থেকে  ভক্তগণ  অগ্রদ্বীপে  আসতেন।  তাতে   যথেষ্ট  আয়  হত।  ঘোষঠাকুরের  ভায়ের  বংশধররা  এসে  সেবাকাজ  চালাতেন।  পূর্ববঙ্গের  বহু  সভ্ৰান্ত  ব্যক্তি  তাঁদের  কারও  কারও  শিষ্যত্ব  গ্রহণ  করলেন।  তাঁরাও  শিষ্য  ও  সম্পত্তি  রক্ষার  জন্য  পূর্ববঙ্গে  বাস  করতে  বাধ্য  হলেন।  এই  সময় তাঁদের  কেউ  কেউ  গোপীনাথ  বিগ্রহকে  পূর্ববঙ্গে  সরিয়ে  নিয়ে  যাওয়ার  চেষ্টা  করেন।  কিন্তু  তাঁদের  যেসব  সরিক  রাঢ়ে  ছিলেন  তাঁরা  গোপীনাথ  বিগ্রহের  অধিকার  ছাড়তে  রাজি  না  হওয়ায়  ড়যন্ত্রকারীরা  গোপনে  একদিন  দেববিগ্রহ  নিয়ে  পালিয়ে  যান। তখন  অগ্রদ্বীপের  অধিবাসীরা  পাটুলির  জমিদারকে ( রাজা  উপাধি  প্রাপ্ত )  গোপীনাথ  বিগ্রহ  উদ্ধারের  জন্য  অনুরোধ  করায়  তিনি  একদল  সৈন্য  পাঠিয়ে  কুষ্টিয়ার  নিকট  বিগ্রহ  উদ্ধার  করেন।  কিন্তু  পাটুলিরাজ  বিগ্রহ  উদ্ধারের  পর  গোপীনাথ  বিগ্রহকে  অগ্রদ্বীপ  বাসীদের  হাতে  না  দিয়ে  পাটুলি-নারায়ণপুরের  রাজবাড়িতে  প্রতিষ্ঠা  করলেন।  গোপীনাথ  অগ্রদ্বীপের  হাতছাড়া  হল।  কেবল  চৈত্রমাসের  একাদশীর  আগে  গোপীনাথকে  অগ্রদ্বীপে  পাঠানো  হত  ঘোষঠাকুরের  শ্রাদ্ধ  উপলক্ষ্যে। 

            এরপর  গোপীনাথ  বিগ্রহ  আবার  হাত  বদল  হয়।  সম্ভবত  অষ্টাদশ  শতকে  বারুণী  উৎসবের  সময়  প্রচুর  জনসমাগম  হয়।  ভিড়ের  চাপে  কিছু  লোকের  প্রাণহানি  ঘটে।  এই  সংবাদে  মুর্শিদাবাদের  নবাব  মুর্শিদকুলি  খাঁ  পাটুলির  রাজাকে  প্রাণহানির  কারণ  দর্শাতে  বলেন।  নির্দিষ্ট  দিনে  পাটুলির  রাজার  উকিল  রাজ  দরবারে  উপস্থিত  থেকেও  ঘাবড়ে  গিয়ে  উত্তর  দানে  বিরত  থাকেন।  এই  সুযোগে  নদিয়ার  রাজা  রঘুরামের  উকিল  নবাবকে  জানান  যে  মেলায়  প্রচুর  জনসমাগমের  ফলে  প্রাণহানি  ঘটেছে।  তবে  ভবিষ্যতে  যাতে  এরকম  না  হয়  সেইজন্য  নদিয়ারাজ  নিশ্চয়  সাবধানতা  অবলম্বন  করবেন। উত্তরে  নবাব  সন্তুষ্ট  হলেন।  উকিলের  কৌশলে  গোপীনাথ  বিগ্রহসহ  অগ্রদ্বীপের  জমিদারি  নদিয়ার  রাজার  হস্তগত  হল।  অগ্রদ্বীপে  নতুন  মন্দির  নির্মাণ  করে  গোপীনাথ  বিগ্রহকে  স্থাপন  করা  হল।  কেবলমাত্র  বারোদোল  উৎসবের  আগে  বিগ্রহকে  কৃষ্ণনগরে  নিয়ে  যাওয়া  হত।  মাস  খানেক  পরে  বিগ্রহ  আবার  অগ্রদ্বীপে  ফিরে  যেতেন।  পরে  ফেরার  সময়  পরিবর্তিত  হয়ে  হয়  দুর্গাপুজোর  পঞ্চমী  কিংবা  ষষ্ঠী।  প্রসঙ্গত  উল্লেখযোগ্য,  বর্তমানে  এই  প্রথা  বন্ধ  হয়ে  গেছে।  বারোদোল  উপলক্ষ্যে  শ্রী  গোপীনাথ  জিউকে  আর  কৃষ্ণনগরে  পাঠানো  হয়  না।  স্নানযাত্রা  উপলক্ষ্যে  গোটপাড়াতেও  আর  বিগ্রহ  পাঠানো  হয়  না।     
   
            শোভাবাজার  রাজবাড়ির  মহারাজা  নবকৃষ্ণ  দেব  তাঁর  মাতৃশ্রাদ্ধ  উপলক্ষে  রাজবাড়িতে  এক  দেবসভার ( বহু  দেবদেবীর  সমাবেশ )  আয়োজন  করেছিলেন।  এই  দেবসভায়  নিমন্ত্রিত  হয়ে  এসেছিলেন  বল্লভপুরের ( শ্রীরামপুর )  রাধাবল্লভ,  খড়দহের  শ্যামসুন্দর,  সাঁইবনার  নন্দদুলাল,  বিষ্ণুপুরের  মদনমোহন  ও  অগ্রদ্বীপের  গোপীনাথ  জিউ।  উৎসব  শেষে  সব  বিগ্রহই  তাঁদের  নিজ  নিজ  মন্দিরে  ফিরে  যান  একমাত্র  গোপীনাথ  বিগ্রহ  ছাড়া।  গোপীনাথের  মোহন  মূর্তি  দেখে  নবকৃষ্ণ  তাঁকে  নিজের  বাড়িতে  রেখে  দিতে  চাইলেন।  তিনি  দাবি  করলেন  যে  গোপীনাথ  তাঁকে  স্বপ্নে  দেখা  দিয়ে  তাঁর  কাছে  থেকে  যাবার  ইচ্ছা  প্রকাশ  করেছেন।  রাজা  কৃষ্ণচন্দ্রের  অধিকারভুক্ত  গোপীনাথের  পরিবর্তে  তিনি  কৃষ্ণচন্দ্রের  ঋণ  মুক্ত  করে  দিতে  চাইলেন।  এই সংক্রান্ত  বিবাদ  পিভি  কাউন্সিল  পর্যন্ত  গড়িয়েছিল।  বিচারের  রায়  নবকৃষ্ণের  বিপক্ষে  যায়।  কৌশলী  রাজা  এক  কারিগরকে  দিয়ে  গোপীনাথের  একটি  প্রতিরূপ  তৈরি  করান।  দুটি  বিগ্রহকে  পাশাপাশি  রেখে  কৃষ্ণচন্দ্রকে  বেছে  নিতে  বলা  হয়।  সঠিক  বিগ্রহ  বাছার  জন্য  গোপীনাথের  পুরোহিতও  উপস্থিত  ছিলেন।  শোভাবাজার  রাজবাড়ির  তরফে  বলা  হয়  কৌশল  করে  নবকৃষ্ণ  আসল  মূর্তিটি  রেখে  দিতে  সক্ষম  হন।  কিন্তু  অন্যমতে,  পুরোহিত  রাতে  স্বপ্ন  দেখেছিলেন  আসল  গোপীনাথের  কপালে  জলবিন্দু   দেখা  যাবে।  কাজে  কাজেই   আসল  গোপীনাথকে  চিনতে  পুরোহিতের  কোন  কষ্টই  হয়  নি।
        
            কথিত  আছে  গোপীনাথের  জন্য  মনোহারিণী  মন্দির  প্রথম  তৈরী  করান  কৃষ্ণনগরের  রাজা  কৃষ্ণচন্দ্র।  কিন্তু  সে  মন্দির  এখন  আর  নেই।  গোপীনাথের  বর্তমান  মন্দিরটি  একটি  ছোট  দালান  মন্দির।  মন্দিরটিতে  এখন  ( ২০১৬)  সংস্কারের  কাজ  চলছে।  তাই  বিগ্রহ  দোলমন্দিরে  স্থানান্তরিত।  দোল  মন্দিরটি  মূল  মন্দিরের  কিছুটা  দূরে  স্থানীয়  স্কুলের  পাশে  অবস্থিত।  মূল  মন্দিরের  পাশে  আছে  গোবিন্দ  ঘোষের  সমাধি  মন্দির। 
                       
            পৃথিবীতে  অনেক  মন্দিরে  অনেক  দেবতা  আছেন।  কিন্তু  কোথাও  দেবতা  ভক্তের  ছেলে  হয়ে,  কাছা  পরে  শ্রাদ্ধ  করছে  শোনা  যায়  না।  তাই  অসংখ্য  ভক্ত  এই  বিশেষ  একাদশী  তিথিতে  অগ্রদ্বীপে  ঘোষ  ঠাকুরের  শ্রাদ্ধ  দেখতে  হাজির  হন।  এই  দিন  কেউ  অন্ন  গ্রহণ  করেন  না।  দই-চিঁড়ে-কলা  খেয়ে  চিঁড়ে  উৎসব  পালন  করেন।  ভক্তরা  ঐ  দিন  মাটির  সরায়  দই-চিঁড়ে-মুড়কি-বাতাসা  দিয়ে  গোপীনাথকে  উৎসর্গ  করেন।  এই  উপলক্ষে  অগ্রদ্বীপে  বিরাট  মেলা  বসে।  সাধারণ  পূর্ণার্থী  ছাড়াও  দলে  দলে  বিভিন্ন  সম্প্রদায়ের  ভক্তগণ  অগ্রদ্বীপে  সমবেত  হয়ে  নাম-কীর্তনে  মেলা-প্রাঙ্গণ  মুখরিত  করে  তোলেন।  সমবেত  বৈষ্ণব  সম্প্রদায়গুলির  মধ্যে  সাহেবধনী  ও  বলরামভজা  দলের  ভিড়  হয়  বেশি।  আসেন  বিভিন্ন  বাউলেরা।  দ্বিতীয়  দিন  ভক্তরা  অন্ন-মহোৎসব  পালন  করেন।  তৃতীয়  দিন  আম  বারুণীর  গঙ্গা-স্নান  করে  তাঁরা  বাড়ি  ফিরে  যান। 


শ্রীগোপীনাথ  জিউ  মন্দির,  অগ্রদ্বীপ 

গোবিন্দ  ঘোষের  সমাধি  মন্দির 
গোপীনাথের  দোলমন্দিরের  শিখর-দেশ 


শ্রীগোপীনাথ  জিউ  ও  শ্রী  রাধিকা  বিগ্রহ 


  
সহায়ক  গ্রন্থাবলি  :
             ১) বর্ধমানের  ইতিকথা ( প্রাচীন  ও  আধুনিক ) : নগেন্দ্রনাথ  বসু  সম্পাদিত 
          ২) বর্ধমান : ইতিহাস  ও  সংস্কৃতি ( ৩ য়  খণ্ড ) :  যজ্ঞেশ্বর  চৌধুরী 
         ৩) গোপীনাথের  উৎসব  ও  মেলা,  অগ্রদ্বীপ : কালীচরণ  দাস  ( বর্ধমান  সমগ্র  ( ৬ ষ্ঠ  খণ্ড ) : গোপীকান্ত  কোঙার  সম্পাদিত )

            

Monday, September 5, 2016

108 Shib Temple,Ambika Kalna,Bardhaman, West Bengal

নবকৈলাশ  মন্দির  ( ১০৮ শিব  মন্দির ), অম্বিকা  কালনা, বর্ধমান 

                                                 শ্যামল  কুমার  ঘোষ 

            অম্বিকা  কালনার  রাজবাড়ি  মন্দির  চত্বরের  দক্ষিণ  দিকের  প্রবেশ-দ্বারের  রাস্তার  বিপরীত  দিকে  ১০৮  শিব  মন্দিরের  প্রবেশ-দ্বার।  যদিও  মন্দিরগুলি  ১০৮  শিবমন্দির  নামেই  পরিচিত  তবে  প্রতিষ্ঠা  লিপি  অনুযায়ী  এটি  ১০৯  টি  শিব  মন্দির  এবং  এর  নাম   'নবকৈলাশ  মন্দির'।  উত্তর  দিকের  মূল  প্রবেশদ্বারের ( সম্ভবত  এই  প্রবেশদ্বারের  বিপরীতে  দক্ষিণ  দিকে  আর  একটি  প্রবেশদ্বার  ছিল।  পরে  বন্ধ  করা  হয়েছে।  কারণ  ওখানেও  একটি  প্রতিষ্ঠালিপি  আছে। )  উপরের  পাথরের  প্রতিষ্ঠালিপিতে  বলা  হয়েছে : 

                      শাকে  চন্দ্রশিবাক্ষিসপ্তি   কুমিতে  শ্রী 
                     তেজচন্দ্রাভিধো   রাজা  সূর্য্য  ইবাস্থি
                     রার্পিতচলচ্চণ্ডপ্রতাপানলঃ
                     শম্ভো  র্ধাম  পরং  নবাধিকশতশ্রী 
                     মন্দিরৈ  র্মণ্ডলং  প্রাকার্ষীম্মহদা 
                     ম্বিকাখ্যনগরে  কৈলাশমেতং  নবং 

            এর  অর্থ  হল,  চন্দ্র = ১,  শিবাক্ষি = ৩,  সপ্ত =৭,  কু =১। 
অঙ্কের  বামাগতি  নিয়মানুসারে,  ১৭৩১  শকাব্দে  ( ১৮০৯  খ্রীষ্টাব্দে )  অম্বিকা  নামক  নগরে  শ্রীতেজশ্চন্দ্র  নামে  রাজা  একশ  নয়টি  শ্রীমন্দিরমণ্ডল  শিবালয়  নবকৈলাশরূপে  তৈরি  করলেন।  রাজা  তেজশ্চন্দ্র  যেন  স্বয়ং  সূর্য।  সূর্যের  মধ্যে  স্থির  আছে  ভয়ঙ্কর  বহ্নি।  রাজা  তেজশ্চন্দ্রের  মধ্যেও  প্রতাপানাল  প্রচণ্ড,  কিন্তু  সচল। 

            কালনার  ১০৯ টি  শিব  মন্দিরের  মধ্যে  ১০৮  টি  শিব  মন্দির,  দুটি  এককেন্দ্রিক  বৃত্তে  অবস্থিত।  বাইরের  বৃত্তে  ৭৪  টি  এবং  ভিতরের  বৃত্তে  ৩৪  টি।  আর  বৃত্তের  বহির্দেশে  একটি।  এককেন্দ্রিক  বৃত্তদ্বয়ের  কেন্দ্রে  রয়েছে  একটি  বড়  ইঁদারা।  এটিকে  শূন্য  অর্থাৎ  নিরাকার  ব্রহ্মস্বরূপ  পরম  শিবের  প্রতীক  বলে  অনেকে  মনে  করেন।  আসলে  হয়তো  এই  ইঁদারাটি  তৈরি  করা  হয়েছিল  মন্দিরের  পূজার  কাজে  ব্যবহৃত  জলের  চাহিদা  মেটাতে।

            ভিতরের  বৃত্তের  পূর্ব  ও  পশ্চিমের  দুটি  প্রবেশদ্বার  আটচালা  মন্দিরাকৃতি।  বাইরের  বৃত্তের  দক্ষিণ  ও  উত্তরের  দুটি  প্রবেশদ্বারও  আটচালা  মান্দিরাকৃতি।  আগেই  উল্লেখ  করেছি  যে  দক্ষিণদিকের  প্রবেশদ্বারটি  বর্তমানে  বন্ধ  আছে।    

            এখানে  বাইরের  বৃত্তের  শিবলিঙ্গগুলি  একটি  কৃষ্ণবর্ণের, পরেরটি  শুভ্রবর্ণের,  পর্যায়ক্রমে। আর  ভিতরের  বৃত্তের  শিবলিঙ্গগুলি  সবই   শুভ্রবর্ণের।  বৃত্তের  বহির্দেশে,  পশ্চিমদিকে  যে  ১০৯  সংখ্যক  শিবমন্দিরটি  রয়েছে  তার  শিবলিঙ্গটি  কৃষ্ণবর্ণের।  মন্দিরের  শুভ্রবর্ণের  শিবলিঙ্গগুলি  ভগবান  সদাশিবের  প্রতীক  এবং  কৃষ্ণবর্ণের  শিবলিঙ্গগুলি  রুদ্রের  প্রতীক। প্রথম  বৃত্তে  ভক্ত  পর্যায়ক্রমে  দেখেন  ভগবান  রুদ্র  ও  সদাশিব  মূর্তি।  শেষে   ভক্ত  বৈকুন্ঠের  অন্তর্গত  তমোগুণ  সম্বন্ধরোহিত  শিবলোকে  পৌঁছে  যান  এবং  সর্বত্রই  সদাশিবের  মূর্তি  প্রত্যক্ষ  করেন। 

            বৃত্তের  মধ্যের  মন্দিরগুলি  আটচালা।  চারচালের  উপরে  ক্ষুদ্রাকৃতি  আরেকটি  চারচালা।  মন্দিরগুলি  অল্প  উঁচু  ভিত্তি  বেদির  উপর  স্থাপিত  এবং  পরস্পর  সংলগ্ন।  মন্দির গুলিতে  টেরাকোটার  কোন  কাজ  নেই।  ১০৯   সংখ্যক  মন্দিরটি  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  প্রতিষ্ঠিত  পঞ্চরত্ন  মন্দির। এর  ছাদের  চারকোণে  চারটি  চূড়া  এবং  মাঝখানে  অপেক্ষাকৃত  বড়  একটি  চূড়া।  বারান্দায়  ওঠার  জন্য  আছে  আটটি  সিঁড়ি।  বর্তমানে  এর  নাম  জলেশ্বর  মন্দির।  শ্রী  যজ্ঞেশ্বর  চৌধুরী  বলেছেন  যে  জপমালায়  যেরূপ  ১০৮  টি  বীজ  গাঁথা  থাকে  এবং  মধ্যস্থলে  ঈষৎ  বড়  আকারের  একটি  বীজ  মেরুস্বরূপ  থাকে  সেই  রকম  এই  শিবক্ষেত্র  নির্মাণের  সময়  উক্ত  বিধান  মানা  হয়েছিল।

            জলেশ্বর  শিবমন্দিরের  মত  আরেকটি  'পঞ্চরত্ন'   মন্দির  রয়েছে  মূল  মন্দির  বৃত্তের  বাইরে  পূর্ব  দিকে।  এর  নাম  রত্নেশ্বর  মন্দির।  অনেকে  মনে  করেন  যে  দেবী  ভাগবতের  ১১০  টির  অনুসরণে  এখানে  ১০৮ + ২ = ১১০ টি  শিবলিঙ্গের  প্রতিষ্ঠা।  তাঁরা  মনে  করেন  যে  প্রতিষ্ঠালিপিতে  'নবাধিক  শত'  বলতে  ১০৯-এর  অধিক  বলা  হয়েছে।   

            নবকৈলাশ  মন্দিরের  প্রবেশদ্বার  দিয়ে  ঢুকলে  বাঁ  দিকে  যে  মন্দিরটি  আছে  তার  শিবলিঙ্গ  শুভ্র  এবং  শিবের  সঙ্গে  আছে  শ্বেতপাথরের  নন্দী।  সমস্ত  মন্দিরের   শিবলিঙ্গগুলি  নিত্য  পূজিত।  দর্শনার্থীদের  মধ্যে  অনেকেই  প্রতিটি  শিবলিঙ্গের মাথ্যায় জল  ঢালেন  এবং  এটাই  রীতি।   
                   

নবকৈলাশ  ( ১০৮ শিবমন্দির ) - ১
নবকৈলাশ  ( ১০৮ শিবমন্দির ) - ২
নবকৈলাশ  ( ১০৮ শিবমন্দির ) - ৩
দক্ষিণ  দিকের  বন্ধ  প্রবেশদ্বার 
ভিতরের  বৃত্তের  প্রবেশদ্বার 
বৃত্তদ্বয়ের  কেদ্রের  ইঁদারা 
মন্দিরে  রাতের  আলোকসজ্জা 
উত্তর  দিকের  প্রতিষ্ঠালিপি 
দক্ষিণ  দিকের  প্রতিষ্ঠালিপি 
শুভ্রবর্ণের  শিবলিঙ্গের  একটি  
কৃষ্ণবর্ণের  শিবলিঙ্গের  একটি 
প্রবেশদ্বারের  বাঁ  দিকের  শিবলিঙ্গ 
জলেশ্বর  শিবমন্দির 
জলেশ্বর  শিবমন্দিরের  সামনের  বিন্যাস 
রত্নেশ্বর  শিবমন্দির 
রত্নেশ্বর  শিবমন্দিরের  সামনের  বিন্যাস 


            অম্বিকা  কালনার  এই  মন্দিরে  যেতে  হলে  শিয়ালদহ  থেকে  সকাল  ৮ টা  ৬ মিনিটের  কাটোয়া  লোকাল  বা  হাওড়া  থেকে  কাটোয়া  লোকাল  ধরুন।  ব্যাণ্ডেল  থেকেও  অম্বিকা  কালনা  যাওয়ার  গাড়ি  পাবেন।  স্টেশন  থেকে  রিকশা  বা  টোটোতে  মন্দিরে  পৌঁছে  যান।  নদিয়া  জেলার  শান্তিপুর  থেকেও  গঙ্গা  পেরিয়ে  কালনায়  যেতে  পারেন। 

 
     
 সহায়ক  গ্রন্থাবলি  :
                 ১) কালনা  মহকুমার  প্রত্নতত্ত্ব   ও  ধর্মীয়  সংস্কৃতির  ইতিবৃত্ত    বিবেকানন্দ  দাস 
                 ২)  বাংলার  মন্দির  স্থাপত্য  ও  ভাস্কর্য  :  প্রণব  রায়