Wednesday, August 31, 2016

Radhaballav Jiu Temple, Serampore, Hooghly

শ্রীরাধাবল্লভ  জিউ'র  মন্দির,  শ্রীরামপুর,  হুগলি

                        শ্যামল  কুমার  ঘোষ 

                                                                                 
            হাওড়া-ব্যাণ্ডেল  রেলপথে  শ্রীরামপুর অষ্টম  রেলস্টেশন। হাওড়া  থেকে  রেলপথে  দূরত্ব  ২০  কিমি।  গ্রান্ট  ট্রাঙ্ক  রোড  এই শহরের  উপর  দিয়ে  চলে  গেছে।  ১৭৫৩  খ্রীষ্টাব্দে  শেওড়াফুলির রাজা  রাজচন্দ্র  রায়  এখানে  রামসীতার  মন্দির  নির্মাণ  করেন।  এই  শ্রীরামচন্দ্র  জিউ  থেকে  শ্রীরামপুর  নামটি  উদ্ভূত  হয়েছে।  ১৭৫৭  খ্রীষ্টাব্দে  ডেনীয়  বা  দিনেমাররা  ডেনমার্কের  তৎকালীন রাজা  পঞ্চম  ফ্রেডরিকের  নামানুসারে  এই  শহরের  নাম  রাখেন ফ্রেডরিক  নগর।  শ্রীপুর,  আকনা,  গোপীনাথপুর,  মোহনপুর  ও পেয়ারাপুর  এই  পাঁচটি  স্থান  নিয়ে  ফ্রেডরিক  নগর  গঠিত  হয়। বার্ষিক  ১৬০১  সিক্কা  টাকা  খাজনায়  দিনেমাররা  শেওড়াফুলি-রাজের  কাছ  থেকে  এই  স্থানগুলি  ইজারা  নেয়।  ১৮৪৫  খ্রীষ্টাব্দে ইংরাজরা  ডেনীয়দের  কাছ  থেকে  এই  শহরটিকে  কিনে  নেয়। আগে  শ্রীরামপুর  মহকুমা  ছিল  না।  ইংরাজদের  হাতে  আসার পর  ১৮৪৭  খ্রীষ্টাব্দে   দ্বারহাট্টা  মহকুমার  বদলে  শ্রীরামপুর মহকুমা  হয়।  বিশপ  হেবার  শ্রীরামপুর  সম্পর্কে  বলেছিলেন  যে  এই  শহরটি  কলকাতার  চেয়ে  বেশি  ইউরোপীয়। 

            শ্রীরামপুর  স্টেশন  থেকে  ২  কিমি  দূরে  বল্লভপুর।  রাধাবল্লভের  নামেই  অঞ্চলটির  নাম  হয়  বল্লভপুর।  এই  বিগ্রহের  প্রতিষ্ঠা  নিয়ে  একটি  কাহিনী  প্রচলিত  আছে।  কথিত  আছে,  শ্রীরামপুরের  পার্শ্ববর্তী  চাতরা  নিবাসী,  বৈষ্ণবচূড়ামণী,  শ্রীচৈতন্য  পরিকর, পণ্ডিত কাশীশ্বরের  বড়  ভাগনে  এই  রাধাবল্লভজিউর  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠা  করেন।  কাশীশ্বর  অত্যন্ত  গোঁড়া  বৈষ্ণব  ছিলেন।  তিনি  প্রতিদিন  নিজের  হাতে  তাঁদের  কুলদেবতা  শ্রীকৃষ্ণের  পূজা  করতেন। তিনি  কোন  অ-বৈষ্ণব  কে  এই  বিগ্রহ  ছুঁতে  দিতেন  না।  একদিন  তিনি  কোন  কারণে  বাড়ির  বাইরে  গিয়েছিলেন।  তাঁর  ফিরতে  দেরি  দেখে  তাঁর  ভাগনে  শাক্তধর্মাবলম্বী  রুদ্ররাম  শ্রীকৃষ্ণের  পূজা  সম্পন্ন  করেন ।  বাড়ি  ফিরে  এসে  কাশীশ্বর  এই  দেখে  খুবই  রাগ  করেন  এবং  রুদ্ররামকে  কটুকথা  বলেন।  মনের  দুঃখে  রুদ্ররাম  গৃহত্যাগ  করে  বর্তমান  বল্লভপুরের  যে  জায়গায়  'হেনরী  মার্টিন  প্যাগোডা'  অবস্থিত  সেখানে  আশ্রয়  নেন  এবং  শ্রীকৃষ্ণের  আরাধনায়  ব্রতী  হন।  তাঁর  ভক্তিতে  সন্তুষ্ট  হয়ে  তাঁর  আরাধ্য  দেবতা  স্বপ্নাদেশ  দেন,  গৌড়ের  রাজপ্রাসাদ  থেকে  শিলা  সংগ্রহ  করে  এই  স্থানে  শ্রীকৃষ্ণ  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠা  করতে।  রুদ্ররাম  গৌড়ে  উপস্থিত  হয়ে  বাদশাহের  হিন্দু  প্রধানমন্ত্রীর  সাহায্যে  একটি  শিলাফলক  সংগ্রহ  করে  বল্লভপুরে  নিয়ে  এলেন  এবং  ওই  শিলাফলকটির  পূজার্চনা  করতে  লাগলেন।  পরে  বৃন্দাবনের  এক  শিল্পী  এসে  ওই  শিলাফলক  থেকে  তিনটি  শ্রীকৃষ্ণ  বিগ্রহ  তৈরী  করে  দেন।  প্রথমটির  নাম  হয়  রাধাবল্লভ,  দ্বিতীয়তীর  নাম  হয়  শ্যামসুন্দর  যে  মূর্তিটি  এখন  খড়দহে  পূজিত  হয়  এবং  তৃতীয়টির  নাম  হয়  নন্দদুলাল  যাঁর  অধিষ্ঠান  সাঁইবনা  বা  সাইবনায়।  ভক্তদের  বিশ্বাস,  একই  দিনে  এই  তিনটি  বিগ্রহ  দর্শন  করলে  আর  পুনর্জন্ম  হয়  না। আবার  অনেকের  ধারণা,  একই  দিনে  ( সূর্যোদয়  থেকে  সূর্যাস্তের  মধ্যে )  উপবাসি  থেকে  এই  তিন  বিগ্রহ  দর্শন  করলে  কলির  তিন  প্রভু  গৌরাঙ্গ,  নিত্যানন্দ  ও  অদ্বৈত  দর্শণের  পুন্যলাভ  হয়।

            সম্ভবত  ১৬৭৭  খ্রীষ্টাব্দে  রুদ্ররাম  ভক্তদের  সহযোগিতায়  রাধাবল্লভের  একটি  আটচালা  মন্দির  গড়ে  তোলেন।  পরবর্তী  সময়ে  গঙ্গার  ভাঙ্গনে  মন্দিরটি  ক্ষতিগ্রস্ত  হওয়ার  সম্ভাবনা  দেখা  দিলে  সেবায়তগণ  বিগ্রহ  স্থানানতরিত  করেন  এবং  মন্দিরটি  পরিত্যক্ত  হয়। পরিত্যক্ত  মন্দিরটি  কিছুকাল  গীর্জা  হিসাবে  ব্যবহৃত  হয়।  পাদ্রি  হেনরি  মার্টিন  সাহেব  কিছুকাল  এখানে  বসবাস  করেন।  এটি  "হেনরী  মার্টিন  প্যাগোডা"  নামে  পরিচিত  হয়।  পরবর্তী  কালে  শ্রীরামপুরে  একাধিক  গির্জা  নির্মিত  হলে  এটির  প্রয়োজন  ফুরিয়ে  যায়।  তারপর  এখানে  মদ  তৈরি  হতে  শুরু  হয়।  এখানে  প্রস্তুত  রাম  প্যাগোডা-রাম  নামে  পরিচিত  হয়। আরো  পরে  পশ্চিমবঙ্গ  সরকার  এটির  দখল  নেন  এবং  কিছু  সংস্কার  হয়।  কিন্তু  আবার  গঙ্গার  ভাঙনের  কারণে  পরিত্যক্ত  হয়।  বর্তমানে  দূর  থেকে  এটিকে  মন্দির  বলে  আর  চেনা  যায়  না।  কাছে  গেলে  তবে  বোঝা  যায়।  বর্তমান  রাধাবল্লভ  মন্দিরের  সামনের  রাস্তা  ধরে  গঙ্গার  ধারে  গেলে  এটিকে  দেখতে  পাওয়া  যাবে।  হাওড়া  জল  প্রকল্প  ( এখন  পরিত্যক্ত )  এলাকার  মধ্যে  জঙ্গলের  মধ্যে  এটিকে  খুঁজে  নিতে  হবে।           

           বল্লভপুরের  বর্তমান  মন্দিরটি  কোলকাতা  নিবাসী  নয়ান চাঁদ  মল্লিক  ১৭৬৪  খৃষ্টাব্দে  নির্মাণ  করে  দেন  এবং  ১৮৩৭  খৃষ্টাব্দে  তাঁর  পুত্র  নিমাই  চরণ  মল্লিক  বিগ্রহের  নিত্যসেবার  চিরস্থায়ী  ব্যবস্থা  করেন।  এটি  বাংলার  বৃহদাকার  আটচালা  মন্দিরগুলির  মধ্যে  অন্যতম।  প্রায়  ৬০  ফুট ( ১৮ মি  )  উঁচু,  লম্বায়  ৫০  ফুট ( ১৫ মি  )  ও  প্রস্থ  ৪০  ফুট ( ১২ মি  )।  উঁচু  ভিত্তি বেদির  উপর  প্রতিষ্ঠিত  মন্দিরটি  দক্ষিণমুখী।  মন্দিরের  সংলগ্ন  অলিন্দ।  তার  সামনে  নাটমন্দির।  গর্ভগৃহে  শ্রী রাধাবল্লভ  ও  শ্রীরাধা  বিগ্রহ।  রাধাবল্লভ  মূর্তিটি  কষ্টিপাথরের।  পাশের  ঘরে  জগন্নাথ,  বলরাম  ও  সুভদ্রার  দারুমূর্তি।  মন্দিরের  গায়ে  খোদাই  লিপি  :  'শ্রীকৃষ্ণ  স্মরণার্থ / শুভমস্তু  শকাব্দ  ১৬৮৬ / দাতা  নয়ান  মল্লিক /  শিল্পকার  শ্রীকৃষ্ণ  দাস।'  ১৯৭৩  সালে  'বিড়লা  জনকল্যাণ  ট্রাস্ট'  মন্দিরটির  সংস্কার  করে।  সমস্ত  বিগ্রহই  নিত্য  পূজিত।  মন্দিরে  বছরের  বিভিন্ন  সময়ে  বিভিন্ন  বৈষ্ণব  উৎসব  অনুষ্ঠিত  হয়।  
                                                      
            আগে  মাহেশের  কমলাকর  পিপলাই  সেবিত  জগন্নাথ  বিগ্রহ  রথে  চড়ে  আসতেন  বল্লভপুর  পর্যন্ত।  বল্লভপুরের  মন্দিরই  ছিল  মাহেশের  জগন্নাথের  গুণ্ডিচা  বাড়ি।  জগন্নাথ  উল্টোরথ  পর্যন্ত  থাকতেন  বল্লভপুরের  মন্দিরে।  তারপর  ফিরে  যেতেন  মাহেশে।  রথের  সময়ের  প্রণামীর  টাকা-পয়সা  নিয়ে  দুই  মন্দিরের  সেবায়তদের মধ্যে  মনোমালিন্যের  ফলে  সেই  প্রথা  বন্ধ  হয়ে  যায়।  ১৮৫১ খ্রীষ্টাব্দে  বল্লভপুর  মন্দিরের  সেবায়তরা  আলাদা  জগন্নাথ,  বলরাম  ও  সুভদ্রার  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠা  করেন।  রাধাবল্লভের  একটি  বৃহৎ  রাসমঞ্চ  গঙ্গার  ঘাটের  কাছে  শ্রীরামপুর  জল  প্রকল্পের  কাছে  আছে।  ১৯৭৩  সালে  'বিড়লা  জনকল্যাণ  ট্রাস্ট'  রাসমঞ্চটির  সংস্কার  করে।  

            মহারাজ  নবকৃষ্ণ  ১৭৭১  খৃষ্টাব্দে  তাঁর  মাতৃশাদ্ধ  উপলক্ষ্যে  এই  শ্রীকৃষ্ণ  তাঁর  বাস  ভবনে  নিয়ে  যান।  কিন্তু  ফিরিয়ে  দিতে  অস্বীকৃত  হলেও  সেবায়তদের  অসম্মতিতে  ফেরত  দিতে  বাধ্য  হন। কিন্তু  বিগ্রহের  ব্যবহারের  জন্য  সোনার  অলঙ্কার  ও  সেবার  জন্য  ভূসম্পত্তি  অর্পণ  করেন।

            বল্লভপুরের  মন্দিরে  যেতে হলে  হাওড়া  থেকে  ব্যাণ্ডেল  গামী  যে  কোন  ট্রেন  ধরুন।  স্টেশনের  বাইরে  থেকে  অটোতে  পৌঁছে  যান  বল্লভপুর।  ঠাকুরবাড়ি  স্ট্রীট  ধরে  একটু  হাঁটলেই  মন্দির।  জি. টি. রোড  ধরে  গাড়িতেও  যেতে  পারেন। 



রাধাবল্লভ  মন্দির ( পূর্ব  দিক  থেকে তোলা )

রাধাবল্লভ  মন্দির ( পশ্চিম  দিক  থেকে তোলা )

মন্দিরের  শিখর-দেশ 

মন্দিরের  কোণাচ 

শ্রীরাধাবল্লভ  ও  শ্রীরাধা  বিগ্রহ 
রাধাবল্লভের  পুরানো  মন্দির 
মন্দিরের  ভগ্ন  খিলান 

রাধাবল্লভের  রাসমঞ্চ 

রাসমঞ্চের  শিখর

     সহায়ক  গ্রন্থাবলি  : 
     ১) পশ্চিম  বঙ্গের  পূজা-পার্বণ  ও  মেলা  ( ২য়  খণ্ড )  :  অশোক  মিত্র  সম্পাদিত 
    ২) পশ্চিমবঙ্গ  ভ্রমণ  ও  দর্শন  : ভূপতিরঞ্জন  দাস
      ৩) হুগলী  জেলার  পুরাকীর্তি : নরেন্দ্রনাথ  ভট্টাচার্য 


             সাইবনার ( উত্তর  ২৪ পরগণা )  নন্দদুলাল  জিউ  মন্দির  সম্বন্ধে  জানতে  নিচের  লিঙ্কে  ক্লিক  করুন :
          নন্দদুলাল  জিউ  মন্দির,  সাইবনা, উত্তর  ২৪  পরগণা 





Wednesday, August 24, 2016

Gopalji Temple, near Siddheshwari Kali Temple, Ambika Kalna, Bardhaman

গোপালজী  মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী  কালী  মন্দিরের  কাছে, অম্বিকা কালনা, বর্ধমান 

                                      শ্যামল কুমার  ঘোষ 

            অম্বিকা  কালনায়  সিদ্ধেশ্বরী  মন্দিরের  মোড়ের  কাছে  গোপালজীর  সুদৃশ্য  পঁচিশচূড়া  মন্দির  অবস্থিত।  এটি  কালনার  তিনটি  পঁচিশচূড়া  মন্দিরের  একটি।  মন্দিরের  গর্ভগৃহের  সামনের  দেওয়ালের  উপরে  পাথরের  ফলকে  সাত  সারির  একটি  সংস্কৃত  লিপি  আছে।  কিন্তু   লিপিটির  উপর  রঙের  প্রলেপ  দেওয়াতে  লিপিটির  পাঠ  সহজসাধ্য  হলেও  অক্ষরের  ছাঁদ  ভিন্ন  ধরনের  হওয়ায়  শুদ্ধ  পাঠ  সম্ভব  নয়।  উদ্ধারীকৃত  লিপিটির  পাঠ  হল  :

                                      'শুভমস্তু  শকাব্দাঃ  ১৬৮৮
                                      শাকাব্দে  শরভাক্তি   রাত্রিপকলা 
                                      কোটীর মৃক্তজভূসংখ্যে  বাহুজ
                                      বংশভুকোমলধীঃ  শ্রীকৃষ্ণচন্দ্রঃ
                                      সুধীঃ।  প্রসাদম্  প্রদদৌ  বিধিয়া  পর
                                      যা  ভক্ত্যাপরব্রহ্মণে  গোপালায়  সমস্ত 
                                      বাঙময়  পথাপ্রীতায়  বিশ্বাত্মনে ।।' 

           অর্থাৎ,  ১৬৮৮  শকাব্দে  ( ১৭৬৬ খ্রীষ্টাব্দে )  বাহুজ  বংশভূ  ( ক্ষত্রিয়  বংশজাত )  শুদ্ধবুদ্ধিসম্পন্ন  শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র  নামক  এক  সুধী  গোপালের  নিমিত্ত  এই  মন্দির  নির্মাণ  করেন।  এটি  রাজা  তিলকচন্দ্রের  রাজত্বকালে  প্রতিষ্ঠিত  হয়। 

            মন্দিরটি  পূর্বমুখী,  উচ্চ  ভিত্তিবেদির  উপর  প্রতিষ্ঠিত।  মন্দিরের  সামনে  রয়েছে  ত্রিখিলান  অলিন্দ।  তার  সামনে  সন্নিবদ্ধ  রয়েছে  একটি  'একবাংলা '  মণ্ডপ।  মণ্ডপটির  মাথায়  লম্বা  একটি  মটকা  বাঁধা  যা  গ্রাম  বাংলার  খোড়ো  চালের  কথা  মনে  করিয়ে  দেয়।

             মন্দিরটির  প্রথম  তলের  ছাদের  চার  কোণে  যে  খাঁজের  সৃষ্টি  হয়েছে  তাতে  তিনটি  করে,  দুটি  চূড়া  সমমাপে  এগোনো,  মাঝেরটা  একটু  পিছানো,  মোট  ১২ টি  চূড়া  স্থাপিত।  তারপর  বেড়  কমিয়ে  খানিকটা  উপরে  অষ্টকোণাকৃতি  ২য়  তল  সৃষ্টি  করা  হয়েছে।  তার  ছাদে  আটকোণে  মোট  ৮ টি  চূড়া।  এরপর  বেড়ের  উচ্চতা  কমিয়ে  ২য়  তলের  চেয়ে  অপেক্ষাকৃত  কম  উচ্চতায়  ৩য়  তল  সৃষ্টি  করা  হয়েছে।  তার  চার  কোণে  ৪ টি  এবং  মাঝে  একটি  বড়  চূড়া।  অর্থাৎ  চূড়াগুলির  সজ্জা  হচ্ছে  ১২+৮+৪+১ ।  মোট  চূড়ার  সংখ্যা  পঁচিশ  এবং  উপরের  তলের  চূড়া  ধরে  মোট  চারতলা।  এই  চূড়াগুলি  চারকোণা  এবং  তাদের  ছাদ  উঁচু-নিচু  কার্নিসের  বিন্যাসে  কিছুটা  পীড়া  শিখরের  অনুরূপ।  

             মন্দিরের  যে  খাঁজ  থেকে   'একবাংলা '  মণ্ডপ  আরাম্ভ  তার  বাইরের  দু  পাশে  টেরাকোটার  কাজ  একতলার   কার্নিস  পর্যন্ত  উঠে  গেছে।  দেওয়ালের  গায়ে  রয়েছে  টেরাকোটার  ফুলকারি  কাজও।  ভাস্কর্যের  ক্ষেত্রে  'কল্পলতা'  বা  'মৃত্যুলতা'কে  দেওয়ালের  কোণে  বা  গায়ে  খাড়াভাবে  লাগানোই  প্রচলিত  রীতি।  এখানেও  তা  একতলার  কার্নিস  পর্যন্ত  উঠে  গেছে।  ( 'কল্পলতা'  হল  উপর  থেকে  নিচে  লতার  মত  কোণাচ।  হাতি,  সিংহ,  লতা-পাতা  অরণ্যের  প্রতীক।  এইভাবে  মন্দির  হয়  অভীষ্ট  ফলপ্রদ  'কল্পতরু'।  আবার  সমস্ত  মায়ার  মৃত্যু  ঘটায়  বলে  একে  'মৃত্যুলতা'-ও  বলা  হয়। - পশ্চিমবঙ্গের  মন্দির : শম্ভু  ভট্টাচার্য )  মন্দিরের  চারটি  দেওয়ালেই  টেরাকোটার  কাজ  আছে। 

            স্থাপত্যের  ক্ষেত্রে  এই  গোপালজীর  পঁচিশচূড়া  মন্দির  এক  অনবদ্ধ  পুরাকীর্তি।  এর  সুচারু  খাঁজকাটা  রত্নগুলির  মধ্যে  এক  অপরূপ  সৌন্দর্য  ফুটে  উঠেছে। মন্দিরের  দেওয়ালে  যেসব  টেরাকোটা  ফলক  আছে  তা  খুবই  আকর্ষণীয়।  অবশ্য  সেই  টেরাকোটার  বেশিরভাগই  নষ্ট  হয়ে  গেছে  বা  নষ্ট  হতে  চলেছে।   দেবদেবী  লীলা  তো  আছেই।  সামাজিক  দৃশ্যের  মধ্যে  আছে  যুদ্ধদৃশ্য,  ইউরোপীয়দের  শ্বাপদ  শিকার,  ঢোলবাদক,  ঢাকবাদক,  দণ্ডায়মান  অবস্থায়  সাহেব  ও  এদেশীয়  স্ত্রীলোকের   মিথুনদৃশ্য, হাতির  উপর  মিথুনদৃশ্য  প্রভৃতি।  

            গর্ভগৃহে  রয়েছে  ১ ফুট  ৬  ইঞ্চির ( ৪৬ সেমি ) গোপাল,  দুটি  কৃষ্ণ  ও  দুটি  রাধার  মূর্তি। সদর  দ্বারের  ঢোকার  মুখের  দুপাশে  রয়েছে  দুটি  পশ্চিমমুখী  আটচালা  শিবমন্দির।   

            এখানে  যে  রথের  টান  হতো  তার  নিদর্শন  স্বরূপ  রয়েছে  একটি  ভাঙা  রথ।  তাছাড়া  মন্দিরের  বাইরে  রয়েছে  রাসমঞ্চ।  মন্দিরে  বিগ্রহের  নিত্যপূজা  ছাড়াও  অন্যান্য  উৎসবও  হয়ে  থাকে।  


  
গোপালজী  মন্দির 
ন্দিরের  প্রতিষ্ঠালিপি 
মন্দিরের  দুটি  ইমারতি  থাম 
মন্দিরে  একটি  খিলানের  কাজ  
মন্দিরের  কোণের  খাঁজ 
মন্দিরের  দেওয়ালে  টেরাকোটা   বিন্যাস- ১ 
মন্দিরের  দেওয়ালে  টেরাকোটা   বিন্যাস - ২
কুলুঙ্গির  মধ্যে  নিবদ্ধ  টেরাকোটা মূর্তি - ১ 
কুলুঙ্গির  মধ্যে  নিবদ্ধ  টেরাকোটা মূর্তি - ২ 
কুলুঙ্গির  মধ্যে  নিবদ্ধ  টেরাকোটা মূর্তি - ৩ 
কুলুঙ্গির  মধ্যে  নিবদ্ধ  টেরাকোটা মূর্তি -৪ 
কুলুঙ্গির  মধ্যে  নিবদ্ধ  টেরাকোটা মূর্তি - ৫ 
কুলুঙ্গির  মধ্যে  নিবদ্ধ  টেরাকোটা মূর্তি - ৬ 
কুলুঙ্গির  মধ্যে  নিবদ্ধ  টেরাকোটা মূর্তি - ৭ 
মন্দিরের  কোণে  মৃত্যুলতা 
মৃত্যুলতার  টেরাকোটা  মূর্তি - ১
মৃত্যুলতার  টেরাকোটা  মূর্তি - ২
মৃত্যুলতার  টেরাকোটা  মূর্তি - ৩
মৃত্যুলতার  টেরাকোটা  মূর্তি - ৪
মিথুন  মূর্তি - ১
মিথুন  মূর্তি - ২
মন্দিরে  টেরাকোটার  ফলক  - ১ 
মন্দিরে  টেরাকোটার  ফলক - ২
মন্দিরে  টেরাকোটার  ফলক - ৩
মন্দিরে  টেরাকোটার  ফলক - ৪
  মন্দিরে  টেরাকোটার  ফলক - ৫
মন্দিরে  টেরাকোটার  ফলক - ৬
মন্দিরে  টেরাকোটার  ফলক - ৭
মন্দিরে  টেরাকোটার  ফলক - ৮
গোপালজী  ও  অন্যান্য  বিগ্রহ


            অম্বিকা  কালনার  এই  মন্দিরে  যেতে  হলে  শিয়ালদহ  থেকে  সকাল  ৮ টা  ৬ মিনিটের  কাটোয়া  লোকাল  বা  হাওড়া  থেকে  কাটোয়া  লোকাল  ধরুন।  ব্যাণ্ডেল  থেকেও  অম্বিকা  কালনা  যাওয়ার  গাড়ি  পাবেন।  স্টেশন  থেকে  রিকশা  বা  টোটোতে  মন্দিরে  পৌঁছে  যান।  নদিয়া  জেলার  শান্তিপুর  থেকেও  গঙ্গা  পেরিয়ে  কালনায়  যেতে  পারেন। 


   সহায়ক  গ্রন্থাবলি   :
                 ১) কালনা  মহকুমার  প্রত্নতত্ত্ব   ও  ধর্মীয়  সংস্কৃতির  ইতিবৃত্ত    বিবেকানন্দ  দাস 
                 ২)  বাংলার  মন্দির  স্থাপত্য  ও  ভাস্কর্য  :  প্রণব  রায় 


        

Tuesday, August 23, 2016

Ananta Basudeb Temple, near Siddheshwari Temple, Ambika Kalna, Bardhaman

অনন্ত  বাসুদেব  মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী  কালী মন্দির,  অম্বিকা  কালনা, বর্ধমান 

                             শ্যামল কুমার ঘোষ 

            সিদ্ধেশ্বরী  কালী  মন্দিরের  অদূরে  রাস্তার  বিপরীতে  অনন্ত  বাসুদেব  মন্দির।  উঁচু  ভিত্তি  বেদির  উপর  প্রতিষ্ঠিত  ইঁটের  তৈরি  'আটচালা'  মন্দির।  মন্দিরটি  দক্ষিণমুখী।  মন্দিরটির  সামনের  দেওয়ালের  কার্নিসের  নিচে  কয়েক  সারির  সংস্কৃত  ভাষার  লিপি  :  

                      ' রসাব্ধিরস  চন্দ্রাঙ্কগণিত্যেব্দে  শকাবধি।
                       চক্রে  বৈকুন্ঠনাথস্য  মন্দিরম্  সুমনোহরম্
                       জগদ্রামস্য  মহিষী  কৃত্তিচন্দ্রনৃপ প্রসু 
                       শ্রী  শ্রী  ত্রিলোকচন্দ্রস্য  নৃপতে র্যা  পিতামহী।।'  
   
            অর্থাৎ  রস = ৬,  অব্দি = ৭, রস = ৬, চন্দ্রাঙ্ক = ১ ।  অঙ্কের  বামাগতি  নিয়মানুসারে,  ১৬৭৬  শকাব্দ  বা  ১৭৫৪  খ্রীষ্টাব্দে  জগৎরাম  রায়ের  মহিষী,  কীর্তিচন্দ্রের  জননী   এবং  রাজা  ত্রিলোকচন্দ্রের  পিতামহী  বৈকুন্ঠনাথের  অতিরমণীয়  এই  মন্দির  নির্মাণ  করলেন। 

             অনন্তবাসুদেবের  মূর্তিটি  কালো  পাথরের  একটি  ফলকে  খোদিত  ভাস্কর্য।  মন্দিরটিতে  এখন  ( ২০১৬ )  সংস্কারের  কাজ  চলছে।  সেজন্য  বাসুদেবের  মূর্তি  ঢাকা  আছে।  শুধু  মুখ  খোলা।  অন্যান্য  মূর্তি  গুলি  সামনের  একটি  মন্দিরে  স্থানান্তরিত। 

            মন্দিরের  সামনে  ত্রিখিলান  অলিন্দ।  খিলানের  উপরে  রয়েছে  নানা  ফুলকারি  নকশা,  রথমধ্যস্থ  শিবলিঙ্গ  ইত্যাদি।   কয়েক  সারি   কুলুঙ্গির  মধ্যে  আছে  নানা  টেরারাকোটা  মূর্তি।  এই  টেরাকোটার   কাজ  ছাদের  বাঁকানো  কার্নিস  পর্যন্ত  উঠে  গেছে।  তবে  বারবার  সংস্কারে  রং  ও  সিমেন্টের  প্রলেপে  টেরাকোটার  অলঙ্করণ  অনেকাংশে  ঢাকা  পড়েছে। 

             অনন্ত  বাসুদেব  মূর্তি  ও  অন্যান্য  দেবদেবীর  মূর্তি  নিত্য  পূজিত।  মন্দিরে  নিত্য  পূজা  ছাড়াও  অন্যান্য  উৎসব  পালিত  হয়। 



অনন্ত  বাসুদেব  মন্দির,  কালনা 
মন্দিরের  সামনের  ত্রিখিলান  বিন্যাস 
মন্দিরের  প্রতিষ্ঠা-লিপি 
মন্দিরের  কোনাচ 
মন্দিরের  উপরের  চারচালা 
মন্দিরের  শিখর -দেশ 
মন্দিরের অন্যান্য  বিগ্রহ - ১
মন্দিরের অন্যান্য  বিগ্রহ - ২
অনন্ত  বাসুদেব  বিগ্রহ 


            অম্বিকা  কালনার  এই  মন্দিরে  যেতে  হলে  শিয়ালদহ  থেকে  সকাল  ৮ টা  ৬ মিনিটের  কাটোয়া  লোকাল  বা  হাওড়া  থেকে  কাটোয়া  লোকাল  ধরুন।  ব্যাণ্ডেল  থেকেও  অম্বিকা  কালনা  যাওয়ার  গাড়ি  পাবেন।  স্টেশন  থেকে  রিকশা  বা  টোটোতে  মন্দিরে  পৌঁছে  যান।  নদিয়া  জেলার  শান্তিপুর  থেকেও  গঙ্গা  পেরিয়ে  কালনায়  যেতে  পারেন। 


    সহায়ক  গ্রন্থাবলি   :
                 ১) কালনা  মহকুমার  প্রত্নতত্ত্ব   ও  ধর্মীয়  সংস্কৃতির  ইতিবৃত্ত    বিবেকানন্দ  দাস 
                 ২)  বাংলার  মন্দির  স্থাপত্য  ও  ভাস্কর্য  :  প্রণব  রায় 
    
      

Saturday, August 20, 2016

Siddheshwari Temple, Ambika Kalna, Bardhaman

শ্রী  শ্রী  অম্বিকা  সিদ্ধেশ্বরী  মহামায়া  মন্দির, অম্বিকা  কালনা, বর্ধমান

                                                           শ্যামল  কুমার  ঘোষ 

            অম্বিকা কালনার  'জোড়বাংলা'  শৈলীর  একমাত্র  মন্দিরটি  হল  শ্রী  শ্রী  অম্বিকা  সিদ্ধেশ্বরী  মহামায়ার।  এই  দেবীকে  অনেকেই  মনে  করেন  যে  ইনি  জৈনদেবী।  আর  তাঁরই  নামানুসারে  হয়  শহর  অম্বিকার  নামকরণ।  পূর্বে  'অম্বিকা'  ও  'নিজ  কালনা'  নামে  দুটি  আলাদা  অঞ্চল  ছিল।  পরবর্তী  কালে  স্থান  দুটি  একীকরণ  করে  নাম  হয়  'অম্বিকা-কালনা'।     সাধারণের  কাছে  এই  দেবী  'সিদ্ধেশ্বরী  কালী'  নামে  পরিচিত  হলেও  মন্দিরের  প্রবেশদ্বারের  উপরে  যে  শ্বেতপাথরের  ফলক  লাগানো  আছে  তাতে  দেবীকে  ওই  পূর্বোক্ত  নামেই  অভিহিত  করা  হয়েছে।  প্রতিষ্ঠা  কাল  দেওয়া  আছে  ৬৮৮  শকাব্দ।   ইঁটের  তৈরী,  দক্ষিণমুখী  এই  মন্দিরটি  সিদ্ধেশ্বরী  মোড়ের  কাছে  অবস্থিত।  মন্দিরের  সামনে  একটি  প্রতিষ্ঠা-লিপি  থাকলেও  বার  বার  দেওয়া  রঙের  প্রলেপে  তা  ভীষণ  অস্পষ্ট।  তবে  পূর্বে  উদ্ধারীকৃত  লিপিটির  পাঠ  হল ঃ

         " শুভমস্তু  শকাব্দা  ১৬৬১/২/২৬/৬  শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী  দেবীং  শ্রীযুক্ত  মহারাজা  চিত্রসেন রায়স্য।  মিস্ত্রি  শ্রীরামচন্দ্র " 

             অতএব  লিপি  থেকে  জানা  যায়  যে  রাজা  চিত্রসেন  ১৬৬১  শকাব্দে  ( ১৭৩৯  খ্রীষ্টাব্দে )  এই  মন্দির  প্রতিষ্ঠা  করেন।  মন্দিরের  মিস্ত্রি  ছিলেন  শ্রীরামচন্দ্র।  মন্দিরের  সামনে  ত্রিখিলান  অলিন্দ।  খিলানগুলির  উপরে  আছে  টেরাকোটার  প্রতীক  শিবমন্দির  ও  তার  মধ্যে  শিবলিঙ্গ।  পোড়ামাটির  কয়েকটি  ফুলও  আছে।  কিন্তু  বার  বার  দেওয়া  রঙের  প্রলেপে  টেরাকোটার  কাজ  খুবই  অস্পষ্ট। 

            কথিত  আছে,  অম্বরীশ  ঋষি  বর্তমান  মন্দিরের  অনতিদূরে  পশ্চিমদিকে  অম্বিকা-পুকুর  নামে  কথিত  পুকুরের  এক  কোণে  বটগাছের  তলায়  পাথরের  কুলোর  উপর  জমাটবদ্ধ  একটি  ঘট  পান।  ( কুলো  সমেত  ঘটটি  মন্দিরে  রক্ষিত  আছে। )  জায়গাটি  ছিল  গভীর  অরণ্যে  পরিপূর্ণ।  তিনি  ঐ  ঘটকে  বর্তমান  মন্দির  যে  স্থানে  অবস্থিত  সেখানে  বটগাছের  তলায়  প্রতিষ্ঠা  করে  সাধনা  করেন  এবং  সিদ্ধিলাভ  করেন।  তখন  মূর্তি  ছিল  না।  ৪/৫  পুরুষ  শিষ্য  পরম্পরায়  সেবাকার্য  চলে। শেষ  সাধক  ঈশ্বরীশ।  তিনি  দেবীর  স্বপ্নাদেশে  মূর্তি  তৈরি  করান।  নিমগাছের  একটি  কাষ্ঠখণ্ডেই  মূর্তি  তৈরি।  ছোট  বহরকুলির  গাঙ্গুলীদের  পুকুরপাড়ের  যে  তিনটি  নিমগাছ  ছিল  তার  মাঝেরটি  দিয়ে  কলকাতার  নিমতলায়  দারুশিল্পীকে  দিয়ে  মূর্তি  তৈরি  করানো  হয়  এবং  পঞ্চমুণ্ডির  আসনের  উপর  বসানো  হয়।  এর  পিছনে  ছিল  গঙ্গা  ও  শ্মশান।  এখানে  নরবলির  প্রথা  ছিল।  এখনও নরবলির  বিকল্পে  ডাব  বলি  দেওয়া  হয়।  মূর্তিটি  জীর্ণ  হলে  অম্বিকা-পুকুরে  বিসর্জন  দেওয়া  হয়।  বর্তমান  মূর্তিটি  এবং  মন্দিরটি  দ্বিতীয়  সংস্করণ।  রাজা  চিত্রসেন  প্রতিমা  দর্শন  করতে  এলে  মন্দির থেকে  পাথরের  চাঁই  খসে  পরে।  রাজা  মন্দিরটিকে  সংস্কার  করান।  অনেকে  বলেন  রাজা  নতুন  করে  মন্দির  নির্মাণ  করান।  ঈশ্বরীশের  কোন  শিষ্য  ছিল  না। স্বপ্নাদেশে  তিনি  সাতগাছিয়ার  চাটুজ্জে  বাড়ির  একটি  ছেলেকে  আনেন।  সেই  ছেলেই  ঠাকুর  সেবার  অধিকার  পান। তাই  পদবি  হয়  অধিকারী।  তখন  থেকেই  বংশানুক্রমে  দেবীর  সেবাকার্য  চলে  আসছে।      

            মন্দিরটি  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  প্রতিষ্ঠিত।  মন্দিরটিতে  উঠবার  জন্য  আটটি  ইঁটের  ঢেউখেলানো  সিঁড়ি  ও  একটি  পাথর  বসানো  সিঁড়ি  আছে।  এই  জোড়বাংলা  রীতির  মন্দিরটির  ভিত্তিক্ষেত্ৰ  ২৭ ফুট  ( ৮.২ মি. ) x  ১০ ফুট ( ৩ মি. )।  ভিত্তিবেদির  উপর  এর  উচ্চতা  ১৫ ফুট  ( ৪.৬ মি. )।  মন্দিরবাড়িটি  পাঁচিল  দিয়ে  ঘেরা।  প্রবেশদ্বারের  মাথায়  রয়েছে  একটি  দণ্ডায়মান সিংহ।  গর্ভগৃহের  প্রবেশদ্বারের  মাথায়ও  রয়েছে  ণ্ডায়মান  জোড়া  সিংহ। যাদের  একটি  করে  পা  উপরে  তোলা। 

            মূর্তিটি  দারুনির্মিত।  চতুর্ভুজা।  দক্ষিণ  দুই  হস্তে  বরাভয়  মুদ্রা।  বামের  ঊর্ধ্বহস্তে  খর্পর,  নিম্নহস্তে  নরমুণ্ড।  দেবীর  বামপদ  এগিয়ে।  তাই  তিনি  বামাকালী।  উচ্চতা  প্রায়  ৫ ফুট  ৬ ইঞ্চি ( ১.৭ মি. )।  দেবী  দারুনির্মিত  হলেও  শিবের  মূর্তিটি  কিন্তু  দারু  নির্মিত  নয়। 

            মা  সিদ্ধেশ্বরীর  প্রতি  বছর  অঙ্গরাগ  হয়। অঙ্গরাগ  শুরু  হয়  বার্ষিকী  পূজার  অর্থাৎ  কার্তিকী  অমাবষ্যার  ১০  দিন  আগে।  তখন  মন্দির  বন্ধ  থাকে।  ঘটে  পুজো  হয়।  ভূতচতুর্দশীতে  অর্থাৎ  দেওয়ালির  আগের  দিন  দেবীর  দিগম্বরী  বেশ  জনসমক্ষে  দেখানো  হয়  সন্ধ্যা  ৭ টা  থেকে  রাত  ১২ টা  পর্যন্ত। তারপর  বস্ত্র  পরিয়ে  হয়  দেবীর  পূজা।  বাৎসরিক  পূজায়  বলিদান  হয়।  পূজা  হয়  তন্ত্র  মতে। 

            মন্দিরের  পূর্ব  দিকে  সারিবদ্ধভাবে  রয়েছে  চারটি  শিবমন্দির।  এদের  মধ্যে  তিনটি  'আটচালা'  রীতির।  এদের  মধ্যে  একটি  প্রতিষ্ঠিত  হয়  ১৬৬৮  শকাব্দে ( ১৭৪৬ খ্রীষ্টাব্দে )।  প্রতিষ্ঠা  করেন  তিলকচন্দ্রের  অমাত্য  রামদেব  নাগ।  রাজা  তিলকচন্দ্রের  মাতা  লক্ষ্মীকুমারী  দেবী  যে  শিবমন্দিরটি  নির্মাণ  করেন  তার  প্রতিষ্ঠাকাল  ১৬৮৫  শকাব্দ  ( ১৭৬৩  খ্রীষ্টাব্দ )।  
   
মন্দিরের  প্রবেশ-দ্বারের  উপরের  সিংহ  মূর্তি

সিদ্ধেশ্বরী  কালী  মন্দির 
মন্দিরের  সামনের  ত্রিখিলান  বিন্যাস 
মন্দিরের  প্রতিষ্ঠা-লিপি 
গর্ভগৃহের  সামনের  জোড়া  সিংহ 
সিদ্ধেশ্বরী  কালী  মাতা - ১
সিদ্ধেশ্বরী  কালী  মাতা - ২
শিবমন্দির 

             অম্বিকা  কালনার  এই  মন্দিরে  যেতে  হলে  শিয়ালদহ  থেকে  সকাল  ৮ টা  ৬ মিনিটের  কাটোয়া  লোকাল  বা  হাওড়া  থেকে  কাটোয়া  লোকাল  ধরুন।  ব্যাণ্ডেল  থেকেও  অম্বিকা  কালনা  যাওয়ার  গাড়ি  পাবেন।  স্টেশন  থেকে  রিকশা  বা  টোটোতে  মন্দিরে  পৌঁছে  যান।  নদিয়া  জেলার  শান্তিপুর  থেকেও  গঙ্গা  পেরিয়ে  কালনায়  যেতে  পারেন। 

           
    সহায়ক  গ্রন্থাবলি   :
                 ১) কালনা  মহকুমার  প্রত্নতত্ত্ব   ও  ধর্মীয়  সংস্কৃতির  ইতিবৃত্ত    বিবেকানন্দ  দাস 
                 ২)  বাংলার  মন্দির  স্থাপত্য  ও  ভাস্কর্য  :  প্রণব  রায়