Friday, April 8, 2016

Shri Shri Bishwamohan Jiu Temple, Goswami Bhattacharya Lane, Santipur, Nadia


         শ্রী শ্রী বিশ্বমোহন  জিউ  মন্দির,  গোস্বামী  ভট্টাচার্য  লেন,                                  শান্তিপুর, নদিয়া

                                                           শ্যামল  কুমার  ঘোষ

               শান্তিপুরের  সর্বশ্রেষ্ঠ  পণ্ডিতবর্গের  অন্যতম  রাধামোহন  গোস্বামী  ভট্টাচার্য  বিদ্যাবাচস্পতি  ছিলেন  ষড়্দর্শনে  পণ্ডিত ।  তিনি  ছিলেন  অদ্বৈতপুত্র  বলরামের  পুত্র  মধুসূদনের  বংশধর  এবং  অদ্বৈতাচার্য  থেকে  অধস্তন  সপ্তম  পুরুষ ।  

               তিনি  নাটোরের  মহারাজ  বিশ্বনাথ  রায়ের  সভায়  সমস্ত  ভারতবর্ষ  থেকে  আগত দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতবর্গকে  পরাজিত  করেন  এবং  ব্রাহ্মণ  নৃপতিকে  শ্রীকৃষ্ণ  মন্ত্রে  দীক্ষিত  করেন ।  প্রসঙ্গত  উল্লেখযোগ্য,  মহারাজ  পূর্বে  শাক্তধর্মাবলী  ছিলেন ।  মহারাজ  বিশ্বনাথ  রানী  ভবানীর  পৌত্র  এবং  নাটোর  রাজবংশের  'বড়  তরফের'  প্রবর্তক ।  মহারানী  নতুন  ধর্ম  গ্রহণে  অস্বীকার  করে  শ্বশুরদত্ত  সম্পতি  নিয়ে  মুর্শিদাবাদ  জেলার  বড়নগরে  গঙ্গাবাসচ্ছলে  গিয়ে  বাস  করেন ।  তখন  মহারাজ  মহারানী  কৃষ্ণমণিকে  বিবাহ  করেন ।  কৃষ্ণমন্ত্রে   দীক্ষা  নিয়ে  বিশ্বনাথ  এক  কৃষ্ণ  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠা  করেন ।  কৃষ্ণমণি  বিশ্বনাথের  'বিশ্ব'  ও  রাধামোহনের  'মোহন'  নিয়ে  কৃষ্ণ  বিগ্রহের  নাম  রাখেন  বিশ্বমোহন ।

               রাধামোহন  গোস্বামীর  পৌত্র  হরিনারায়নণ  গোস্বামীও  ছিলেন  নাটোর  রাজবংশের  গুরু ।  মহারাজ  বিশ্বনাথ  ও  মহারানি  কৃষ্ণমণি  শান্তিপুরে  আসেন  এবং  শ্রীশ্রী  বিশ্বমোহন জিউকে  সেবাকার্য  চালানোর  জন্য  দান  করেন ।  হরিনারায়ণ  মহারানি  কৃষ্ণমণির   সহায়তায়  শান্তিপুরের  গোস্বামী  ভট্টাচার্য  লেনের  নিজের  বাড়িতে   শ্রীশ্রী  বিশ্বমোহন  জিউকে  প্রতিষ্ঠা  করেন ।  বর্তমানে  বিগ্রহ  একটি  দালান  মন্দিরে  প্রতিষ্ঠিত ।  বিগ্রহের  নিত্য  পূজা  ছাড়াও  রাসোৎসব  সহ  অন্যান্য  বৈষ্ণব-পার্বণ  এখানে  পালন  করা হয় ।



শ্রী বিশ্বমোহন  জিউ  মন্দির 

শ্রী বিশ্বমোহন  জিউ  ও  রাধিকা  বিগ্রহ 

               শান্তিপুরের  শ্রী শ্রী বিশ্বমোহন  বিগ্রহ  দেখতে  হলে  শিয়ালদহ  থেকে  শান্তিপুর  লোকাল  ধরুন ।  রেলপথে  শান্তিপুরের  দূরত্ব  ৯৩  কি. মি. ;  ট্রেনে  সময়  লাগে  আড়াই  ঘন্টা ।  স্টেশন  থেকে  রিকশায়  বা  টোটোতে  পৌঁছে  যান  গোস্বামী  ভট্টাচার্য  লেন ।
         

  সহায়ক  গ্রন্থাবলি  :
               
১. শান্তিপুর - পরিচয় ( ২ য়  ভাগ ) :  কালীকৃষ্ণ  ভট্টাচার্য
               ২. রাসোৎসব - ২০১৫  উপলক্ষে  শান্তিপুর  বিগ্রহবাড়ি  সমন্বয়  সমিতি  কর্তৃক  প্রকাশিত  পুস্তিকা                            

Thursday, April 7, 2016

Ramchandra Temple, Guptipara, Hooghly


রামচন্দ্রের  মন্দির,  গুপ্তিপাড়া,  হুগলি
  
শ্যামল  কুমার  ঘোষ

            ব্যাণ্ডেল-কাটোয়া  রেলপথে  গুপ্তিপাড়া  একটি  স্টেশন ।  ব্যাণ্ডেল  থেকে  দূরত্ব  ৩৫  কি. মি. ।  স্টেশন  থেকে  দেড়  কি.মি.  দূরে  তারকেশ্বরের  মোহান্তের  অধীন  দশনামী  শৈবসম্প্রদায়ের  মঠবাড়ি  এলাকায়  গুপ্তিপাড়ার  প্রসিদ্ধ  মন্দিরগুলি  অবস্থিত । এই  মঠবাড়ি  এলাকায়  মোট  চারটি  মন্দির  বর্তমান ।  কৃষ্ণচন্দ্রের  'আটচালা',  মহাপ্রভুর  'জোড়বাংলা',  বৃন্দাবনচন্দ্রের  'আটচালা'  ও  রামচন্দ্রের  'একরত্ন' ।  মন্দিরগুলি  একসঙ্গে  'বৃন্দাবনচন্দ্রের  মঠ'  বা  'গুপ্তিপাড়ার  মঠ'  নামে  পরিচিত ।

            এখানে  আলোচ্য  বিষয়  শ্রী রামচন্দ্রের  মন্দির ।   অন্য  তিনটি  মন্দিরের  আলোচনা  অন্যত্র  করেছি ।  এই  তিনটি  মন্দির  সম্বন্ধে  জানতে  নিচের  লিঙ্কে  ক্লিক  করুন :
                 বৃন্দাবনচন্দ্রের  মঠ,  গুপ্তিপাড়া,  হুগলি   

            গুপ্তিপাড়ার  উল্লেখযোগ্য  দ্রষ্টব্য  শ্রীরামচন্দ্রের  মন্দির ।  বাঁশবেড়িয়ার  অনন্ত বাসুদেব  মন্দিরের  মত  এর  গড়ন ।  এরূপ  কারুকার্যখচিত  মন্দির  পশ্চিমবঙ্গে  খুব  কমই  আছে ।  এর  টেরাকোটার  কাজ  খুবই  উচ্চ  শ্রেণীর ।  উঁচু  ভিত্তিবেদির  উপর  স্থাপিত, পশ্চিমমুখী,  ইঁটের  তৈরী  মন্দিরটি  বাংলা  একরত্ন  শ্রেণীর ।  মন্দিরের  শিখর-রত্নটি  আটকোণা ।  মন্দিরের   সামনে  তিনটি  পত্রাকৃতি  খিলান  যুক্ত  আবৃত  অলিন্দ  আছে ।  সামনের  ত্রিখিলান  প্রবেশপথের  ওপরের  তিনপ্রস্থে,  থাম  ও  ভিত্তিবেদি  সংলগ্ন  দেওয়ালে  এবং  শিখরে  প্রচুর উৎকৃষ্ট  টেরাকোটা  আছে ।  টেরাকোটায়  রাধাশ্যামের  মূর্তি,  গরুড়বাহন  বিষ্ণু,  রাবণের  যুদ্ধযাত্রা  প্রভৃতি  সুন্দর  ভাবে  ফুটে  উঠেছে ।  একটি  খিলানের   উপর  প্রার্থনার  ভঙ্গিতে  যুক্ত  শত  শত  গোপিনী  মূর্তি  পোড়ামাটির  অলংকরণের  একটি  সুন্দর  নিদর্শন ।  প্রবেশ  পথের  দু  পাশে  তিন  সারিতে  ও  উপরে  দু  সারিতে  নিবদ্ধ  নকশা  করা  ফ্রেমের  মধ্যে (কুলুঙ্গি )  রাধা-কৃষ্ণ  ও  নরনারীর  নানা  ভঙ্গিমার  চিত্র  ফুটে  উঠেছে ।  এরূপ  সুক্ষ্ম  ও  ছন্দময়  কারুকার্য  হুগলি  জেলার  কোন  মন্দিরে  নেই ।  তবে  এর   বেশির  ভাগ  মূর্তিই  নষ্ট  হয়ে  গেছে ।  থামের  উপরের  দিকের  ও  অলিন্দের  মধ্যের  টেরাকোটাগুলি  কলিচুনের  প্রলেপে  নষ্ট  বা  ম্লান  হয়ে  গেছে ।  দক্ষিণ  দিকের  দেওয়ালেও  প্রচুর  টেরাকোটার  কাজ  আছে ।  তবে  এখানে  তিনটি  খিলান  ছাড়া  অন্যত্র  টেরাকোটার  ফুলের  আধিক্যই   বেশি ।  রামচন্দ্রের  মন্দির  পোড়ামাটির  সজ্জার  জন্য  বাংলার  অন্যতম  টেরাকোটা  মন্দির  বলে  পরিগণিত ।  মন্দিরের  সামনের  দিকে  তিনটি  প্রবেশদ্বার ।  সোজাসুজি  একটি  বড়,  দুপাশে  দুটি  ছোট-ছোট ।  উত্তর  ও  দক্ষিণ  দিকে  একটা  করে  জানলা  আছে ।  পূর্ব  দিকে  কোন  জানলা  বা  দরজা  নেই ।  গর্ভগৃহে  রামচন্দ্র,  সীতা,  লক্ষ্মণ  ও  হনুমানের  কাঠের  মূর্তি  প্রতিষ্ঠিত ।  মন্দিরটি  প্রতিষ্ঠা  করেন  শেওড়াফুলির  রাজা  হরিশচন্দ্র  রায় । 


রামচন্দ্রের  মন্দির 

আটকোণা  শিখর-রত্ন

সামনের  দিকের  খিলানের  উপরের  কাজ -১

সামনের  দিকের  খিলানের  উপরের  কাজ -২

সামনের  দিকের  খিলানের  উপরের  কাজ -৩


দক্ষিণ  দিকের  খিলানের  উপরের  কাজ -১


দক্ষিণ  দিকের  খিলানের  উপরের  কাজ -২

দক্ষিণ  দিকের  খিলানের  উপরের  কাজ -৩

সামনের  দিকের   দুটি   খিলানের  মধ্যের   টেরাকোটার  অলংকরণ 

নাচের  ভঙ্গিমা -১

নাচের  ভঙ্গিমা -২

থামের  গায়ে  টেরাকোটার  অলংকরণ 

মহিষমর্দিনী  ও  অন্যান্য  মূর্তি

রাসমণ্ডল 

টেরাকোটার  অলংকরণ 
কুলুঙ্গিতে  নিবদ্ধ  টেরাকোটার  অলংকরণ - ১ 

কুলুঙ্গিতে  নিবদ্ধ  টেরাকোটার  অলংকরণ - ২

কুলুঙ্গিতে  নিবদ্ধ  টেরাকোটার  অলংকরণ - ৩

কুলুঙ্গিতে  নিবদ্ধ  টেরাকোটার  অলংকরণ - ৪

কুলুঙ্গিতে  নিবদ্ধ  টেরাকোটার  অলংকরণ - ৫
ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন  টেরাকোটার  অলংকরণ - ১

ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন  টেরাকোটার  অলংকরণ - ২

ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন  টেরাকোটার  অলংকরণ - ৩

ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন  টেরাকোটার  অলংকরণ - ৪
ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন  টেরাকোটার  অলংকরণ - ৫

ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন  টেরাকোটার  অলংকরণ - ৬

ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন  টেরাকোটার  অলংকরণ - ৭

ভিত্তিবেদি-সংলগ্ন  টেরাকোটার  অলংকরণ - ৮

রাম,  লক্ষ্মণ  ও  সীতার  দারুমূর্তি


            গুপ্তিপাড়ার  মঠে  যেতে  হলে  শিয়ালদহ  থেকে  সকাল  ৮ টা  ৬  মিনিটের  কাটোয়া  লোকাল  বা  হাওড়া  থেকে  কাটোয়া  লোকাল  ধরুন ।  ব্যাণ্ডেল  থেকেও  গুপ্তিপাড়া  যাওয়ার  গাড়ি  পাবেন ।  স্টেশন  থেকে  মন্দিরে  যাওয়ার  রিকশা,  টোটো  বা  ভ্যান  রিকশা  পাবেন ।

  সহায়ক  গ্রন্থাবলি  :
             ১.  বাংলার  মন্দির : স্থাপত্য  ও  ভাস্কর্য  :  প্রণব  রায় 
             ২.  District  Handbook, 1951, hooghly  by  A. Mitra, p 227
             ৩.  পশ্চিমবঙ্গের  পুরাকীর্তি  :  রামরঞ্জন  দাস