Tuesday, September 29, 2015

Kuliar Pat, Kalyani, Nadia

   
কুলিয়ার  পাট, গয়েশপুর, কল্যাণী, নদিয়া 
     
শ্যামল  কুমার  ঘোষ

             শ্রীচৈতন্যদেব  ও  শ্রীনিত্যানন্দের   স্মৃতিবিজড়িত   কুলিয়ার  পাট  বৈষ্ণবদের  একটি  তীর্থস্থান । কল্যাণী  রেলস্টেশন  থেকে  ২.৫  কি. মি.  উত্তর-পূর্বে  অবস্থিত ।   পৌষ  মাসের  কৃষ্ণা  একাদশী  তিথিতে  শ্রীচৈতন্যদেব   এই  গ্রামের  বৈষ্ণব-নিন্দুক  পণ্ডিত  দেবানন্দের  অপরাধ  ভঞ্জন  করেন  ।  তাই  একে  অপরাধভঞ্জনেরও  পাট  বলা  হয় । কেউ  কেউ  একে  দেবানন্দের  পাটও  বলে  থাকেন । একটি  সুন্দর  মন্দিরে  দারু  নির্মিত  গৌর-নিতাই  বিগ্রহের  নিত্য পূজা  হয় ।  তা  ছাড়া  শ্রীকৃষ্ণ,  রাধিকা  ও  অন্যান্য  বিগ্রহও   আছেন ।  পাশের  একটি  ঘরে  শিবলিঙ্গ  প্রতিষ্ঠিত ।  দক্ষিণমুখী  মন্দিরটি  দেউল  শ্রেণীর,  একটি  সমতল  ছাদ  দালানেন  উপর  খাঁজকাটা  দেউল-শিখর  স্থাপিত ।  সামনে  নাটমন্দির । মন্দিরটি  নির্মাণ  করেন  কলকাতা  নিবাসী  ধর্মপ্রাণ  শ্রী  গৌরচরণ  মল্লিক ।  পরে  কলকাতা  নিবাসী  শ্রী কানাইলাল  ধর  কঠিন  রোগাক্রান্ত  হয়ে  শ্রীগৌরাঙ্গের  শরণাগত  হন  এবং  মহাপ্রভুর  কৃপায়  রোগমুক্ত  হয়ে  মন্দিরের  উন্নতি  সাধন, নাটমন্দির,  দেবানন্দ  স্বামী  ও চাপাল-গোপালের  দুটি  সমাধি  মন্দির  ইত্যাদি  নির্মাণ  করে দেন । এখানকার  একটি  শিউলি  গাছ  কে  'বাঞ্ছাকল্পতরু ' বল়া  হয় ।  এই  গাছের   নিচে  ভক্তরা  অপরাধ  ভঞ্জনের  প্রতীক  অনুষ্ঠান  পালন  করে  থাকেন ।  মন্দিরের  পাশে  কুলিয়া  বিলের  ঘাটটি  খুব সুন্দর ।  নির্জন  ও  ছায়া-শীতল ।  বর্তমানে  কলকাতার  পিঞ্জরাপোল  সোসাইটি    ( ঠিকানা : ৩৪, আরমেনিয়ান  স্ট্রীট, কলকাতা - ১ )  মন্দিরটির  দেখাশোনার  কাজে  নিয়োজিত ।
            
             কুলিয়ার  পাট  সম্পর্কে  নানা  কাহিনী  প্রচলিত   আছে ।  প্রথমটি,  দেবানন্দ   ছিলেন  কুলিয়া  গ্রামের  অধিবাসী ।  জ্ঞানবান,  তপস্বী,  কিন্তু ভক্তিহীন  মোক্ষাভিলাষী ।  শ্রীমদ্ ভাগবতের  অধ্যাপনা  করতেন ।  একদিন  শ্রীচৈতন্যদেবের  পার্শ্বচর  শ্রীবাস  পণ্ডিত  ভাগবতের  ব্যাখ্যা  শোনবার  জন্য  তাঁর  বাড়িতে  আসেন ।  ভাগবতের  পাঠ  শুনতে  শুনতে  শ্রীবাস  প্রেমাবিষ্ট  হলেন ।  তিনি  উচ্চৈস্বরে  কাঁদতে  লাগলেন । পাগলের  পাগলামি  মনে  করে  দেবানন্দ  ও  তাঁর  ছাত্ররা  শ্রীবাসকে  মারতে  মারতে  বাড়ির  বাইরে  বার  করে  দেন ।  এই  অপরাধে  দেবানন্দ  কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্থ  হন । মহাপ্রভুর  কীর্তন-সঙ্গী বক্রেশ্বের  পণ্ডিতের  কৃপায়  দেবানন্দের  ভক্তিতত্ত্বে  বিশ্বাস জন্মায় । তিনি  বুঝতে  পারেন  মহাপ্রভু  স্বয়ং  শ্রীকৃষ্ণের  অবতার ।  শ্রীবাস  পণ্ডিতের  প্রতি  তাঁর ব্যবহারের  জন্য  অনুশোচনা  হয় ।  তখন  এই কুলিয়া  গ্রামের  পাশ  দিয়ে  যমুনা নদী  বয়ে  যেত ।  দেবানন্দ  এই  নির্জন  কুলিয়া  গ্রামে  এসে  সাধন  ভজনে  ব্রতী   হন ।  মহাপ্রভু  কুলিয়া  গ্রাম  হয়ে  কুমারহট্ট  ( বর্তমান হালিসহর )  যাওয়ার  সময়  এখানে  এলে  দেবানন্দ  মহাপ্রভুর  চরণে  তাঁর  দুঃখের  কথা  নিবেদন  করেন  এবং  একটা  কুলোয়  করে  মুলো, পালং শাক, চাল  ইত্যাদি  দিয়ে  সিধা  দেন ।  মহাপ্রভু   দেবানন্দকে  যমুনায়  স্নান  করে  আসতে  বলেন ।  যমুনার  জলে  ডুব  দেওয়া  মাত্র  দেবানন্দের  দেহ  থেকে কুষ্ঠব্যাধি  নির্মূল  হয় । ঐ  সিধা  রান্না  করে   মহাপ্রভু  একাদশীর  উপবাস  ভঙ্গ  করেন । তারপর  যমুনার  ধারে  সারা  রাত  ধরে  হরিনাম  সংকীর্তন  করেন ।  কয়েক  বছর  পরে  ঐ  তিথিতেই  দেবানন্দ  দেহত্যাগ  করেন ।  পৌষ  মাসের  কৃষ্ণা  একাদশীতে  দেবানন্দের  অপরাধ   ভঞ্জন  হয়েছিল  বলে  সেই  থেকে  ঐ  তিথিতে  দেবানন্দের  সমাধির  পাশে  অপরাধ-ভঞ্জনের  মেলা  বসে ।  লোক-বিশ্বাস  ওই  দিন  এখানে  এসে  গৌর-নিতাই  বিগ্রহ  দর্শন  করে  কুলিয়ার  পাটে  স্নান,  পূজার্চ্চনা ও বনভোজন  করলে  সব  পাপ  ও  অপরাধ  ভঞ্জন  হয় ।  যমুনা  এখন  আর  প্রবাহিনী  নয়, বদলে  বিরাট  'কুলিয়ার  বিলে'  পরিণত  হয়েছে ।  মন্দিরের  পশ্চিমে  দেবানন্দ  গোস্বামী  ও  চাপাল  গোপালের ছোট  ছোট  দুটি  সমাধি মন্দির আছে ।

             দ্বিতীয়টি,  মহাপ্রভু  শ্রীবাস  পণ্ডিতের  গৃহে  ভক্তবৃন্দ  ও  পারিষদগণ  সহ  প্রতি  রাত্রে  হরিনাম  সংকীর্তন  করতেন ।  হরিনাম  বিদ্বেষী  লোকেরা  সংকীর্তনের  সময়  গোলমাল  করবে  ভেবে  বাড়ির  দরজা  বন্ধ  রাখতেন । হরিনাম  বিদ্বেষী  চপল  প্রকৃতি  গোপাল  নামক  এক  ব্রাহ্মণ  মহাপ্রভুর  কীর্তনে  বাধা  দিতে  এসে  দ্বার  বন্ধ  থাকার  জন্য  বাড়ির  মধ্যে  প্রবেশ  করতে  না   পেরে  " বহির্দ্বারের  সম্মুখে  জল  ও  গোময়  লেপিত  স্থানে  কদলী  পত্রের  উপর  জবা-পুস্প, রক্তচন্দন, সিন্দুর, হরিদ্রা, আতপ  তণ্ডুল  এবং  তৎপার্শ্বে  মদ্যভাণ্ড " রেখে  যান ।  সকালে  দরজা  খোলার  পর  ভক্তবৃন্দ  ও  পারিষদগণ  সহ  মহাপ্রভু   এই  সব  জিনিস  দেখতে  পান ।  এই  অপরাধে  চাপাল  গোপালের  তিন  দিন  পরেই  কুষ্ঠ  ব্যাধি  হয় ।  পরে  মহাপ্রভু  নীলাচল  হতে  কুলিয়ায়  এলে  চাপাল  গোপালের  অপরাধ  ভঞ্জন  হয় ।  সেই  থেকে   কুলিয়া  পাটের  নাম   "অপরাধভঞ্জনের  পাট "  নামে  অভিহিত  হয় ।

             কুলিয়া  পাটে  যেতে  হলে  শিয়ালদহ  থেকে   সকালের  লালগোলা প্যাসেঞ্জাররানাঘাট, শান্তিপুরগেদেকৃষ্ণনগর  বা  কল্যাণী  সীমান্ত  লোকালে  উঠুন   নামুন  কল্যাণী  স্টেশনে  স্টেশনের  পূর্ব  দিক  থেকে  রিকশা  পাবেন   নং  প্ল্যাটফর্মের  স্টেশন  ভবনের  পশিম  দিক  থেকে  কাষ্ঠডাঙ্গা  গামী   ম্যাজিক  গাড়িও  পাবেন  দুপুর  ১২ টা  ৩০ মিনিট  থেকে  বিকাল  ৪ টা  পর্যন্ত   মন্দির  বন্ধ  থাকে  

 
কুলিয়া  পাটের  মন্দির
মন্দিরের  শিখরদেশ
গর্ভগৃহের  সামনের  কাজ
দেবানন্দ  গোস্বামী  ও  চাপাল  গোপালের  সমাধি  মন্দির  
বাঞ্ছাকল্পতরু
কুলিয়া  বিলের  ঘাট
গৌরনিতাই  ও  অন্যান্য  বিগ্রহ
গৌরনিতাই  বিগ্রহ
কৃষ্ণ-রাধিকা  বিগ্রহ


 সহায়ক  গ্রন্থাবলি  :
        ১. পশ্চিমবঙ্গের পূজা-পার্বণ  ও  মেলা ( ৩ য়  খণ্ড  ) :  অশোক  মিত্র  সম্পাদিত 
        ২. পশ্চিমবঙ্গ  ভ্রমণ  ও  দর্শণ  : ভূপতিরঞ্জন  দাস
        ৩. কুলিয়ার  পাট  :  শ্রী  পঞ্চানন  ঘোষ
             

Sunday, September 20, 2015

Nandadulal Jiu Temple, Saibona, North 24 Parganas

  নন্দদুলাল  জিউ  মন্দির, সাইবনা, উত্তর  ২৪  পরগণা

                               শ্যামল  কুমার  ঘোষ 

            সাইবনা  বা  সাঁইবনা  উত্তর  ২৪  পরগণার  একটি  গ্রাম।  এখানে নন্দদুলাল  জিউ'র  একটি  মন্দির  আছে।  এটি  সমতল  ছাদ  বিশিষ্ট, পূর্বমুখী, একটি  দালান  মন্দির।  মন্দিরের  গর্ভগৃহের  উপর  একটি  উচ্চ  শিখর  অবস্থিত।  মন্দিরের  সামনে  নাটমন্দিরটি  গর্ভগৃহ  সংলগ্ন । ঘরের  মধ্যে  একটি  কাঠের  মঞ্চে  'নন্দদুলাল  জিউ'  নামে  খ্যাত  কৃষ্ণ  ও  রাধার  যুগল  মূর্তি  প্রতিষ্ঠিত  আছে।  সম্ভবত  ষোল  শতকের  প্রথমে  এই  মূর্তি  প্রতিষ্ঠিত  হয়েছিল।  রাধিকা  মূর্তিটি  ধাতুময়ী  এবং  কৃষ্ণ  মূর্তিটি  কষ্টিপাথরের  তৈরী।  ঘরে  অপর  একটি  পৃথক  আসনে  জগন্নাথ, সুভদ্রা  ও  বলরামের  দারুময়  মূর্তি আছে। 

            প্রবাদ,  হুগলি  জেলার  শ্রীরামপুরের  পার্শ্ববর্তী  চাতরা  নিবাসী,  বৈষ্ণবচূড়ামণী,  শ্রীচৈতন্য  পরিকর,  পণ্ডিত   কাশীশ্বর  অত্যন্ত  গোঁড়া  বৈষ্ণব  ছিলেন।  তিনি  প্রতিদিন  নিজের  হাতে  তাঁদের  কুলদেবতা  শ্রীকৃষ্ণের  পূজা  করতেন। তিনি  কোন  অবৈষ্ণব  কে  এই  বিগ্রহ  ছুঁতে  দিতেন  না। একদিন  তিনি  কোন  কারণে  বাড়ির  বাইরে  গিয়েছিলেন।  তাঁর  ফিরতে  দেরি  দেখে  তাঁর  ভাগনে ( অন্য  মতে,  দৌহিত্র )  শাক্তধর্মাবলম্বী  রুদ্ররাম  শ্রীকৃষ্ণের  পূজা  সম্পন্ন  করেন । বাড়ি  ফিরে  এসে  কাশীশ্বর  এই  দেখে  খুবই  রাগ  করেন  এবং  রুদ্ররামকে  কটুকথা  বলেন। মনের  দুঃখে  রুদ্ররাম  গৃহত্যাগ  করে  বর্তমান বল্লভপুরের  যে  জায়গায়  হেনরী  মার্টিন  প্যাগোডা  অবস্থিত  সেখানে  আশ্রয়  নেন  এবং  শ্রীকৃষ্ণের  আরাধনায়  ব্রতী  হন। তাঁর  ভক্তিতে  সন্তুষ্ট  হয়ে  তাঁর  আরাধ্য  দেবতা  স্বপ্নাদেশ  দেন,  গৌড়ের  রাজপ্রাসাদ  থেকে  শিলা  সংগ্রহ  করে ওই  স্থানে  শ্রীকৃষ্ণ  বিগ্রহ  প্রতিষ্ঠা  করতে।  রুদ্ররাম  গৌড়ে  উপস্থিত  হয়ে  বাদশাহের  হিন্দু  প্রধানমন্ত্রীর  সাহায্যে  একটি  বড়  শিলাখণ্ড  সংগ্রহ  করে  বল্লভপুরে  নিয়ে  এলেন  এবং  ওই  শিলাখণ্ডটি  পূজার্চনা  করতে  লাগলেন। পরে  বৃন্দাবনের  এক  শিল্পী  ওই  শিলাখণ্ড  থেকে  তিনটি  শ্রীকৃষ্ণ  বিগ্রহ  তৈরী  করে  দেন। কাশীশ্বরের  তিন  ভাগনে  ( অন্য  মতে, দৌহিত্র )  এই  তিনটে  শ্রীকৃষ্ণ  বিগ্রহের  সেবার  ভার  নেন। বড়  রুদ্ররাম  বল্লভপুরের   রাধাবল্লভজিউর, মেজ  রামরাম  খড়দহের  শ্যামসুন্দরজিউর, এবং  ছোট  লক্ষ্মণ  সাইবনের  নন্দদুলালজিউর  পূজার  ভার  গ্রহণ  করেন। অন্য  মত  হল, নিত্যানন্দ  প্রভুর  পুত্র  বীরভদ্র  গোস্বামী  গৌড়ের  রাজপ্রাসাদ  থেকে  উক্ত  পাথর  সংগ্রহ  করেছিলেন  এবং  বৃন্দাবনের  এক  বিখ্যাত  শিল্পীকে  দিয়ে  তিনটি  সুন্দর  কৃষ্ণমূর্তি  তৈরী  করান।  বীরভদ্র  গোস্বামীর  ইচ্ছায়  এই  তিন  বিগ্রহ পূর্বোক্ত  তিন  জায়গায়  প্রতিষ্ঠিত  হয়।  ভক্তদের  বিশ্বাস, একই  দিনে  এই  তিনটি  বিগ্রহ  দর্শন  করলে  আর  পুনর্জন্ম  হয়  না। আবার  অনেকের  ধারণা, একই  দিনে  ( সূর্যোদয়  থেকে  সূর্যাস্তের  মধ্যে )  উপবাসি  থেকে  এই  তিন  বিগ্রহ  দর্শন  করলে  কলির  তিন  প্রভু  গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দ  ও  অদ্বৈত  দর্শণের  পুন্যলাভ  হয়।

            মন্দির  সম্মুখস্থ  নাটমন্দিরটি  শ্রীমতী  ভবতারিনী  দেবী  কর্তৃক  ৭ ই  শ্রাবণ  ১৩২৫  সনে  এবং  বাংলা  ১৩৬২  কলকাতার  এন্টনি  বাগানের  অক্ষয়  কুমার  নন্দী  কর্তৃক  সংস্কার  করা  হয়েছে। নাটমন্দির  সহ  মূল  মন্দিরটি  পাঁচিল  দিয়ে  ঘেরা।  পাঁচিলের  ভিতরে   প্রবেশদ্বারের  ডান  দিকে  পাশাপাশি  দুটি  ইঁটের  তৈরী  আটচালা  মন্দিরে  শিবলিঙ্গ  প্রতিষ্ঠিত।

            নন্দদুলালজিউর  নিত্য  পূজা  ছাড়াও  বছরের  বিভিন্ন  সময়ে  বিভিন্ন  উৎসব  অনুষ্ঠিত  হয়।  এর  মধ্যে  মাঘী  পূর্ণিমার  উৎসব  ও  ফাল্গুণ  পূর্নিমায়  দোল  উৎসব  উল্লেখযোগ্য।  দোলযাত্রা উপলক্ষে  মন্দিরে  নন্দদুলালজিউর  যথারীতি  পূজার  পর  বিগ্রহদ্বয়কে  মন্দির  থেকে  দোলায়  চাপিয়ে  কাছের  একটি  দোলমঞ্চে  স্থাপন  করে  দেবদোলপর্ব  অনুষ্ঠিত  হয়। দোলমঞ্চটি  প্রাচীন  এবং  দেখতে  সুন্দর।  বাংলা  ১৩৬৫ সনে  প্রাচীন  দোলমঞ্চটির  সংস্কার  করা  হয়।  প্রতিবৎসর  রথযাত্রা  উপলক্ষে  এই  মন্দিরে  জগন্নাথের  বিশেষ  পূজা  হয়  এবং  জগন্নাথ, বলরাম  ও  সুভদ্রাকে  একটি  রথে  স্থাপন  করে  টানা  হয়।  

            সাইবনার  নন্দদুলালজিউ  মন্দিরে  যেতে  হলে  ব্যারাকপুর  স্টেশন  বা  বারাসত  বাসস্ট্যান্ড  থেকে  ৮১  নং  বাসে  উঠুন।  ব্যারাকপুর-বারাসত  রোডের  উপর  মাথারাঙ্গিতে  নামুন।  ওখান  থেকে  অটো  বা  ভ্যান  রিকশায়  পৌঁছে  যান  মন্দিরে। বারাকপুর  থেকে  বাসের  বদলে  নীলগঞ্জের  অটোতেও  উঠতে  পারেন।  ফেরার  সময়  মন্দির  থেকে  গাড়ি  না  পেলে  হেঁটে  সূর্যপুর  দত্তের  পোলে  আসুন।  ওখান  থেকে  গাড়ি  পাবেন। খড়দহ  থেকেও  যেতে  পারেন।  দুপুরে  মন্দির  বন্ধ  থাকে। 

 

শ্রী  নন্দদুলাল  মন্দির- ১ 

শ্রী  নন্দদুলাল  মন্দির - ২

মন্দিরের  শিখরদেশ

শ্রীশ্রীনন্দদুলাল  ও  রাধিকা   বিগ্রহ - ১

শ্রীশ্রীনন্দদুলাল  ও  রাধিকা   বিগ্রহ - ২

জগন্নাথ, বলরাম  ও সুভদ্রার  বিগ্রহ

শিব  মন্দির

দোলমঞ্চ, সাইবনা

 

  সহায়ক  গ্রন্থাবলি  :

          ১. পশ্চিমবঙ্গের পূজা-পার্বণ  ও  মেলা ( ৩ য়  খণ্ড  ) অশোক  মিত্র  সম্পাদিত 

          ২. পশ্চিমবঙ্গ  ভ্রমণ  ও  দর্শণ  : ভূপতিরঞ্জন  দাস 



            বল্লভপুরের  ( শ্রীরামপুর,  হুগলি )  রাধাবল্লভ  জিউ  মন্দির  সম্বন্ধে  জানতে  নিচের  লিঙ্কে  ক্লিক  করুন :

 

Saturday, September 19, 2015

Jagannath Temple, Jashora, Chakdaha, Nadia

জগন্নাথ  মন্দির, যশড়া, চাকদহ, নদিয়া  

  শ্যামল  কুমার  ঘোষ      

               শিয়ালদহ-রানাঘাট  রেল-লাইনে  চাকদহ  একটি  স্টেশন । কলকাতা  থেকে  দূরত্ব  ৬২ কি মি । ট্রেনে  সময়  লাগে  ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট । চাকদহ  স্টেশন  থেকে  পশ্চিম  দিকে  ২  কি. মি. দূরে  যশড়া  গ্রাম ।  নদিয়া  জেলায়  অবস্থিত  এই  যশড়া  গ্রামে  শ্রীচৈতন্য  মহাপ্রভুর  অন্যতম  পারিষদ  তথা  দ্বাদশ  সখার  অন্যতম,  প্রসিদ্ধ  বৈষ্ণব  জগদীশ  পণ্ডিতের  শ্রীপাঠ   জগন্নাথ  দেবের  একটি  মন্দির  অবস্থিত । পূর্বে  মন্দির সংলগ্ন একটি  সুপ্রসিদ্ধ  দোলমঞ্চ  ছিল । বড়োই  পরিতাপের  বিষয়  বর্তমানে  দোলমঞ্চটি  ধ্বংস  প্রাপ্ত ।  শ্রীচৈতন্যদেব    শ্রীনিত্যানন্দপ্রভু  এখানে  পদার্পণ  করে  ছিলেন । কথিত  আছে, মহাপ্রভু  সপারিষদ  নিলাচলে  অবস্থান  কালে  একবার  জগন্নাথ  দেব  নবকলেবর  ধারণ করেন ।  জগদীশ  পণ্ডিত  পুরীর  জগন্নাথ  দেবের  পরিত্যক্ত  পুরাতন   দারুময়  বিগ্রহটি  পুরীধাম  থেকে  দণ্ডে  বহন  করে  নবদ্বীপের  উদ্দেশে  যাত্রা  করেন । উদ্দেশ্য  বিগ্রহ  পুনঃ  প্রতিষ্ঠা  করা । বিশাল  বিগ্রহ  দণ্ডে  ঝুলিয়ে  দুজনে  কাঁধে  করে  বয়ে  নিয়ে  চলেছেন ।  পথিমধ্যে  যশড়ায় রাত্রি  যাপন  করলেন ।  পরদিন  প্রাতঃকৃত্যাদি  সেরে  জগন্নাথ  কে  কাঁধে  তুলবার  সময়  আর  ওঠাতে  পারলেন  না । দারু-মূর্তি  শিলার  চেয়েও  ভারী  বোধ  হল ।  দৈববাণী  হল, আমি  এখানেই  অবস্থান  করব । সেই  থেকে  জগন্নাথ  এখানেই  আছেন । জগদীশ  পণ্ডিত  বাকি  জীবন  এখানেই  বসবাস  করে  জগন্নাথের  সেবায়  অতিবাহিত  করেন ।
                 সুভদ্রা   বলরাম  বিহীন  জগন্নাথ  দেবের  কাঠের  বিগ্রটির উচ্চতা  ৪ ফুট  (১.২ মি.) । জগন্নাথ দেব ছাড়াও  শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাধাবল্লভ   বলদেব  জিউ-এর  মূর্তি  আছে ।  আর আছেন  জগদীশ-পত্নী 'দুঃখিনী মাতা'-পূজিত গৌর গোপাল।  পুরীধাম  থেকে  জগন্নাথ  দেবের  বিগ্রটি  বহন  করে  আনবার  জন্য  জগদীশ  পণ্ডিত  যে  বড়  লাঠিটি  ব্যবহার করেছিলেন  সেটি  এখানে  সযত্নে  রক্ষিত  আছে ।
                বহুবার  সংস্কৃত  মন্দিরটি  দালান  শ্রেণীর । মন্দিরের  সামনের  নাটমন্দিরটি  পাঁচ  খিলান  বিশিষ্ট ।  শোনা  যায়,  কৃষ্ণনগরের  মহারাজ  কৃষ্ণচন্দ্র  মন্দিরটি  নির্মাণ  করে  দেন  এবং  দেব  সেবার  জন্য  কয়েকশো  বিঘা  জমি  দেবত্র  করে  দেন । কিন্তু  বর্তমানে  সেই  জমির  সামান্যই  মন্দির-কর্তৃপক্ষের  হাতে আছে । মন্দিরে জ্যৈষ্ঠ  পূর্ণিমায়  জগন্নাথ  দেবের  স্নানযাত্রা,  পৌষ  মাসের  শুক্লা  তৃতীয়া  তিথিতে  জগদীশ  পণ্ডিতের  তিরোভাব  উৎসব  ও অন্যান্য  উৎসব  অনুষ্ঠিত  হয় ।  বর্তমানে " শ্রীচৈতন্য  গৌড়ীয়  মঠ " মন্দিরটির  দেখাশোনা   পরিচালনার  কাজে  নিয়োজিত । 

                যশড়ার  জগন্নাথ  মন্দিরে  যেতে হলে  শিয়ালদহ  থেকে  সকালের  লালগোলা প্যাসেঞ্জার, রানাঘাট, শান্তিপুর,  গেদে  বা  কৃষ্ণনগর  লোকালে  উঠুন ।  নামুন  চাকদহ  স্টেশনে । রেলগেটের  পশ্চিম  দিক  থেকে  রিকশা  বা  ভ্যান-রিকশায়  উঠে  পৌঁছে  যান  মন্দিরে । আসবার  সময়  মন্দির  থেকে  রিকশা  পাবেন না ।  একটু  হেঁটে  নারকেল  বাগানে  আসতে  হবে । দুপুরে  ১২ টা  থেকে  ৪ টা পর্যন্ত  মন্দির  বন্ধ  থাকে ।  দুপুরে  আহারের (প্রসাদ ) জন্য  সকাল  ১২ টার  মধ্যে  যেতে  হবে ।  থাকার  ইচ্ছে  হলে  অতিথিশালায়  থাকতে  পারেন। ।

          মন্দিরের  ঠিকানাশ্রী শ্রী জগন্নাথ  মন্দির, পোঃ- যশড়াভায়া - চাকদহ, জেলা - নদিয়া, পিন - ৭৪১২২২




শ্রী জগন্নাথ  মন্দির 

মন্দিরের  প্রবেশ-দ্বার 

শ্রী জগন্নাথ দেব  ও  অন্যান্য  বিগ্রহ 

শ্রী জগন্নাথ  বিগ্রহ 

শ্রী রাধাবল্লভ  বিগ্রহ 

শ্রীকৃষ্ণ, বলদেব  ও  গৌরগোপাল  বিগ্রহ 

বাগানের মঞ্চ,এখানে স্নানযাত্রার সময় জগন্নাথদেবকে রাখা হয়  

মঞ্চের উপর আসন, পিছনে ধ্বংস প্রাপ্ত দলমঞ্চ 

প্রাচীন দলমঞ্চ (পশ্চিমবঙ্গ পত্রিকার সৌজন্যে )

মাধব গোস্বামী মহারাজের ভজন কুটীর 

জগন্নাথদেব বিগ্রহ বহনের লাঠি 

সহায়ক  গ্রন্থাবলি  :
                 ১. নদিয়া  জেলার  পুরাকীর্তি :  মোহিত  রায়  ( তথ্য-সংকলন  ও  গ্রন্থনা  )
                 ২. পশ্চিমবঙ্গ  ভ্রমণ  ও  দর্শন  : ভূপতিরঞ্জন  দাস